উত্তর জনপদের শস্যভাণ্ডার খ্যাত নওগাঁ জেলা, আর এ জেলার আত্রাই উপজেলা ঐতিহ্যগতভাবেই এ অঞ্চল আম ও ধান উৎপাদনের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। তবে আমের এই রাজ্যে এখন গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে গ্রীষ্ম মৌসুমের অন্যতম জনপ্রিয়, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও সুমিষ্ট রসালো ফল কাঁঠাল। চলতি জ্যৈষ্ঠের খরতাপের মাঝেই জেলার গ্রামীণ জনপদের প্রতিটি গাছে এখন কাঁঠালের সমারোহ। যদিও পূর্ণাঙ্গ পাকা কাঁঠাল পুরোদমে বাজারে উঠতে আর মাত্র দিনকয়েক বাকি,তবুও গাছে গাছে ঝুলন্ত ফলের এই দৃশ্য এখন পুরো নওগাঁর আত্রাই উপজেলা জুড়েই নজর কাড়ছে।
প্রবাদ আছে, ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’। জ্যৈষ্ঠের এই সময়ে এসে কথাটি আর কেবল কথার কথা হয়ে নেই,বরং বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে আত্রাই উপজেলার গ্রামীণ জনপদে, বাড়ির পাশে, রাস্তার ধারে কিংবা ঝোপঝাড়ের ভেতরের গাছগুলোতেও প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল ধরেছে। অনেক গাছের গোঁড়া থেকে শুরু করে মগডাল পর্যন্ত ঝুলছে ছোট-বড় অসংখ্য কাঁঠাল। উপজেলাজুড়ে প্রধান অর্থকরী ফল হিসেবে আম চাষের ব্যাপকতা থাকলেও, ঘরের আঙিনায় কিংবা পতিত জমিতে থাকা কাঁঠাল গাছগুলো গ্রামীণ অর্থনীতি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে প্রতি বছরই বড় ভূমিকা রেখে আসছে।
খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ফলমূলের দিক থেকে নওগাঁ জেলা বেশ বৈচিত্র্যময় তেমনি আত্রাই উপজেলাও কোন অংশে কমতি নেই, আত্রাই উপজেলার মানুষের কাছে যুগ যুগ ধরে কাঁঠাল যেমন ফল হিসেবে সমাদৃত, তেমনি তরকারি হিসেবেও এর কদর অন্যরকম।
বিশেষ করে কাঁঠালের বিচি এখানকার মানুষের অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও প্রিয় একটি খাদ্য উপাদান। কাঁঠালের বিচি দিয়ে শুঁটকি ভর্তা কিংবা বিভিন্ন ধরনের শাকের সঙ্গে কাঁঠালের বিচির যুগলবন্দী রান্না এই অঞ্চলের মানুষের অন্যতম তৃপ্তিদায়ক খাবার। শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবেই নয়, কাঁঠালের ছাল গবাদিপশুর জন্য অত্যন্ত উন্নতমানের পুষ্টিকর গো-খাদ্য এবং এর পাতা গৃহপালি পশুর প্রিয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া কাঁঠাল গাছের শক্ত কাঠ আসবাবপত্র তৈরির জন্যও এ অঞ্চলে বেশ সমাদৃত।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাঁঠালের বহুমাত্রিক ব্যবহারের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এর গুরুত্ব অনেক। উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, কাঁঠাল এমন একটি ফল যার কোনো অংশই ফেলে দেওয়া যায় না। কাঁঠাল কাঁচা অবস্থায় এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘এঁচোড়’ বা সবজি হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়, আর পাকলে তো কথাই নেই। তরকারিতে আলুর বিকল্প হিসেবে কাঁঠালের বিচির ব্যবহার এখানকার রান্নার একটি চেনা বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে ছোট মাছ ও বিভিন্ন সবজির সাথে কাঁঠালের বিচির মেলবন্ধন এ অঞ্চলের ভোজনরসিকদের রসনা তৃপ্ত করে।
উপজেলার স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে এখনো পুরোদমে কাঁঠাল কেনাবেচা শুরু না হলেও, ব্যবসায়ীদের ধারণা জ্যৈষ্ঠের শেষ ও আষাঢ়ের শুরু থেকেই পুরো জেলাজুড়ে পুরোদমে কাঁঠালের বাজার জমে উঠবে।
সার্বিক এই কাঁঠাল উৎসবের আমেজ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে উপজেলার ভবানীপুর, বান্দাইখাড়া, আহসানগঞ্জ এলাকায়। আত্রাইয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এবার প্রতিটি গাছেই গত বছরের তুলনায় বাম্পার ফলন হয়েছে। উপজেলার ভবানীপুর পালপাড়া গ্রামের শিক্ষক শ্রী দেবেন্দ্রনাথ পাল জানান, কাঁঠাল অত্যধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন একটি ফল হওয়ায় এর চাহিদা সবসময়ই থাকে।
আত্রাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদার এই ভালো ফলনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে সুনির্দিষ্টভাবে বাণিজ্যিক কোনো কাঁঠালের বাগান না থাকলেও, দিন দিন মানুষের মাঝে কাঁঠালের চারা রোপণের প্রতি আগ্রহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার কাঁঠালের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে, যা স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে অর্থনৈতিকভাবেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আব্দুল মজিদ মল্লিক,আত্রাই (নওগাঁ) 























