সংবাদ শিরোনাম ::
যমুনা অয়েলে গণবদলি নিয়ে আলোচনা, তালিকায় নেই আওয়ামী পন্থী দেলোয়ার সিন্ডিকেট শ্রীমঙ্গলে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী মোহনপুরে কৃষি প্রণোদনা বিতরণ উদ্বোধন কুমিল্লায় বিজিবির অভিযানে ৬৮ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে দেশে ফেরত এলেন ২২১ জন ভোলায় গৃহবধূ মিতুর মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী-শাশুড়িসহ ৩ আসামী গ্রেফতার চট্টগ্রামে শিশু আয়াত হত্যা : আসামি আবিরের মৃত্যুদণ্ড আদেশ দিল আদালত আত্রাইয়ে রেলওয়ে লাইনের পাশ থেকে শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার সন্ধ্যার মধ্যে দেশের ৮ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না প্রবাসীরা

লামায় প্রাকৃতিক সম্পদ ছন-বাঁশ-গাছ-পাথর বিলুপ্তের পথে: হুমকির মুখে পরিবেশ ও জৈব বৈচিত্র্য

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বান্দরবানের লামা উপজেলা পাহাড়, বনভূমি, ঝিরি ও নদীনালার পাশাপাশি বাঁশ, ছন ও পাথর দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং পরিবেশগত নানা কারণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে পরিবেশবিদ,স্থানীয় জনগণ এবং সচেতন মহলের মধ্যে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় লামার পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও ছনের দেখা মিলত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা ঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি, কৃষিকাজ এবং দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে এসব সম্পদ ব্যবহার করতেন। একই সঙ্গে নদী ও পাহাড়ি ছড়াগুলোতে প্রচুর পাথর পাওয়া যেত, যা স্থানীয় নির্মাণকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

কিন্তু গত এক দশকে ব্যাপক হারে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে বাঁশ,গাছ,ও ছনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে পাহাড়গুলো একসময় সবুজ বাঁশঝাড়ে আচ্ছাদিত ছিল, সেগুলোর অনেক জায়গা এখন ফাঁকা হয়ে গেছে। ফলে বাঁশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি এর দামও বেড়ে গেছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক বছর আগেও লামার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সহজেই ছন সংগ্রহ করা যেত। গ্রামের অধিকাংশ ঘরের ছাউনি তৈরি হতো ছন দিয়ে। বর্তমানে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। ছনের প্রাকৃতিক বিস্তার কমে যাওয়ায় এটি এখন অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, পাহাড়ি ঝিরি ও নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে অনেক ছড়া ও ঝিরির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে ভাঙন, আবার বর্ষাকালে বাড়ছে ভূমিক্ষয়।

পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বাঁশ, ছন ও পাথর শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এগুলো পাহাড়ি পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাঁশ মাটির ক্ষয় রোধ করে, ছন পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে কাজ করে এবং প্রাকৃতিকভাবে থাকা পাথর পাহাড়ি জলধারার ভারসাম্য রক্ষা করে। এসব সম্পদের সংকট ভবিষ্যতে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ঘর নির্মাণ কিংবা কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ সহজেই পাওয়া যেত। এখন বাইরে থেকে বেশি দামে বাঁশ কিনতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। একইভাবে ছনের সংকটের কারণে ঐতিহ্যবাহী ছনের ঘর নির্মাণ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাঁশ ও ছনের নতুন চারা রোপণ, বনভূমি সংরক্ষণ, অবৈধভাবে সম্পদ আহরণ বন্ধ এবং পাথর উত্তোলনে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পদ সংরক্ষণে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে,আজ যদি বাঁশ,গাছ,ছন ও পাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো লামার ঐতিহ্যবাহী এসব সম্পদের নামই শুধু শুনবে, বাস্তবে দেখতে পাবে না। তাই পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য একসময় খ্যাত লামা উপজেলা আজ নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাঁশ, গাছ, ছন ও পাথরের অস্তিত্ব রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই পারে এই সম্পদগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যমুনা অয়েলে গণবদলি নিয়ে আলোচনা, তালিকায় নেই আওয়ামী পন্থী দেলোয়ার সিন্ডিকেট

লামায় প্রাকৃতিক সম্পদ ছন-বাঁশ-গাছ-পাথর বিলুপ্তের পথে: হুমকির মুখে পরিবেশ ও জৈব বৈচিত্র্য

আপডেট সময় ০৬:০৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বান্দরবানের লামা উপজেলা পাহাড়, বনভূমি, ঝিরি ও নদীনালার পাশাপাশি বাঁশ, ছন ও পাথর দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং পরিবেশগত নানা কারণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে পরিবেশবিদ,স্থানীয় জনগণ এবং সচেতন মহলের মধ্যে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় লামার পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ ও ছনের দেখা মিলত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা ঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি, কৃষিকাজ এবং দৈনন্দিন নানা প্রয়োজনে এসব সম্পদ ব্যবহার করতেন। একই সঙ্গে নদী ও পাহাড়ি ছড়াগুলোতে প্রচুর পাথর পাওয়া যেত, যা স্থানীয় নির্মাণকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

কিন্তু গত এক দশকে ব্যাপক হারে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে বাঁশ,গাছ,ও ছনের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে পাহাড়গুলো একসময় সবুজ বাঁশঝাড়ে আচ্ছাদিত ছিল, সেগুলোর অনেক জায়গা এখন ফাঁকা হয়ে গেছে। ফলে বাঁশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি এর দামও বেড়ে গেছে।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক বছর আগেও লামার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সহজেই ছন সংগ্রহ করা যেত। গ্রামের অধিকাংশ ঘরের ছাউনি তৈরি হতো ছন দিয়ে। বর্তমানে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। ছনের প্রাকৃতিক বিস্তার কমে যাওয়ায় এটি এখন অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, পাহাড়ি ঝিরি ও নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে অনেক ছড়া ও ঝিরির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে ভাঙন, আবার বর্ষাকালে বাড়ছে ভূমিক্ষয়।

পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বাঁশ, ছন ও পাথর শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এগুলো পাহাড়ি পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাঁশ মাটির ক্ষয় রোধ করে, ছন পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে কাজ করে এবং প্রাকৃতিকভাবে থাকা পাথর পাহাড়ি জলধারার ভারসাম্য রক্ষা করে। এসব সম্পদের সংকট ভবিষ্যতে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে ঘর নির্মাণ কিংবা কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ সহজেই পাওয়া যেত। এখন বাইরে থেকে বেশি দামে বাঁশ কিনতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। একইভাবে ছনের সংকটের কারণে ঐতিহ্যবাহী ছনের ঘর নির্মাণ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, বিলুপ্তপ্রায় এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাঁশ ও ছনের নতুন চারা রোপণ, বনভূমি সংরক্ষণ, অবৈধভাবে সম্পদ আহরণ বন্ধ এবং পাথর উত্তোলনে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পদ সংরক্ষণে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের মতে,আজ যদি বাঁশ,গাছ,ছন ও পাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো লামার ঐতিহ্যবাহী এসব সম্পদের নামই শুধু শুনবে, বাস্তবে দেখতে পাবে না। তাই পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য একসময় খ্যাত লামা উপজেলা আজ নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাঁশ, গাছ, ছন ও পাথরের অস্তিত্ব রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই পারে এই সম্পদগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।