রংপুর নগরীর শ্যামাসুন্দরী খাল পুনঃখনন ও পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা অভিযোগ, অনিয়মের দাবি এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এক ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্যে একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য উঠে আসছে। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধরণ, কাজের গুণগত মান, দখল উচ্ছেদ না হওয়া এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামকে ঘিরে সমালোচনা ও দায় নির্ধারণের আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে, যদিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণিত নয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্যামাসুন্দরী খাল একসময় রংপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে খালটি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং অনেক স্থানে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এই অবস্থায় সরকারিভাবে খাল পুনঃখনন, সাইড ওয়াল নির্মাণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বনায়নের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যার ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, রংপুর কার্যালয়। প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর বর্তায়। এই প্রেক্ষাপটে রবিউল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠনের দাবি, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে শুরু থেকেই অনিয়ম দেখা গেছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো—কাজের মান নিম্নমানের, খাল খননের ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অপ্রতুল পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং খনন করা মাটি সঠিকভাবে অপসারণ না করে পুনরায় খালেই ফিরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের দুই পাশে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ না করেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত খনন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, শুধু খনন কাজ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়, বরং খালের সঙ্গে সংযুক্ত নদী প্রবাহ পুনরুদ্ধার, দখল উচ্ছেদ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করে স্থানীয় একাধিক নাগরিক সংগঠনও দাবি করেছে যে প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি সাব-কনট্রাক্টের মাধ্যমে অন্য একটি পক্ষকে দিয়ে বাস্তবায়ন করছে। এই সাব-কনট্রাক্টর আহসানুল হক মুকুল নামের একজন ব্যক্তি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনে কাজ করছেন এবং কোনো ধরনের গাফিলতি করা হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কাজের অগ্রগতি ও মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামকে কেন্দ্র করে সমালোচনার প্রধান বিষয় হলো তদারকির ঘাটতি। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে মনিটর করা হচ্ছে না, ফলে ঠিকাদাররা ইচ্ছামতো কাজ করছে। তবে এই অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবস্থান ভিন্ন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি চলমান অবস্থায় রয়েছে এবং কাজের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তারা আরও দাবি করেছে, যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাল পুনঃখননের সময় কিছু স্থানে কোদাল ও এক্সকেভেটরের সীমিত ব্যবহার দেখা গেছে, যেখানে গভীর ও পরিকল্পিত ড্রেজিং প্রয়োজন ছিল। এছাড়া খালের পাড়ে উত্তোলিত মাটি দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় বৃষ্টির সময় আবার তা খালে ফিরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিষয়গুলো প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছেন যে খালের আশপাশে ব্যাপক অবৈধ দখল ও অবকাঠামো থাকায় পূর্ণমাত্রায় যান্ত্রিক খনন সব জায়গায় সম্ভব হচ্ছে না। কিছু এলাকায় স্থান সংকটের কারণে সীমিত পদ্ধতিতে কাজ করতে হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এই প্রকল্পের লক্ষ্য তাৎক্ষণিক জলাবদ্ধতা হ্রাস এবং পরিবেশ উন্নয়ন, যা আংশিকভাবে হলেও অর্জিত হতে পারে।
এদিকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান না থাকলে এই ধরনের প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। তারা দাবি করেন, শুধু অর্থ ব্যয় করলেই সমস্যা সমাধান হয় না, বরং নগর ব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নদী সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। তাদের মতে, শ্যামাসুন্দরী খালের ক্ষেত্রে সেই সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট।
রবিউল ইসলাম সম্পর্কে কিছু স্থানীয় অভিযোগে বলা হয়েছে যে তিনি ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেন এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগকে “গুজব বা যাচাইবিহীন দাবি” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রকল্পের সময়সীমা অনুযায়ী কাজ ২০২৫ সালের শেষ দিকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এখনো প্রকল্পটি প্রাথমিক বা মধ্য পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের প্রাথমিক ধাপে কাজের পূর্ণ ফলাফল দেখা না গেলেও, শুরুতেই যদি স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
স্থানীয় জনগণের একটি অংশ মনে করে, খালটি তাদের শহরের প্রাণ, এবং এর পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। তারা দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন চায়। অন্যদিকে, প্রশাসনিক পর্যায়ে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটি নিয়ম অনুযায়ী চলছে এবং পর্যায়ক্রমে সব সমস্যা সমাধান করা হবে।
এই দ্বিমুখী অবস্থানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, কাজের মান, ঠিকাদার নিয়োগ এবং তদারকি ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ যদি যথাযথভাবে অনুসরণ না করা হয়, তাহলে জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে এককভাবে দায়ী করার আগে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।
বর্তমানে শ্যামাসুন্দরী খাল প্রকল্প ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রকল্পের সীমিত সমস্যা নয়, বরং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সামগ্রিক চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রকল্পে প্রশাসন, ঠিকাদার, স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকা ছাড়া সফলতা পাওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে, রংপুরের শ্যামাসুন্দরী খাল সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এই প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে কোনো দায় নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে প্রকল্পটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে স্বচ্ছ তদন্ত, তথ্য যাচাই এবং প্রশাসনিক পর্যালোচনা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















