শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) যেন ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়ের ভেতরে ঢুকে পড়া কর্মকর্তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে—এমন অভিযোগ এখন আর গোপন নয়। দায়িত্বে অবহেলা, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। অভিযোগের পাহাড় জমলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক পরিচয় কি প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে?
বর্তমানে মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জেলায় দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তখন তা আর ব্যক্তিগত সমালোচনার পর্যায়ে থাকে না—তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত হয়। অথচ এখানেই দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত নীরবতা। অভিযোগ আছে, কিন্তু তদন্ত নেই; প্রশ্ন আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই; বিতর্ক আছে, কিন্তু পরিণতি নেই।
এর আগে মানিকগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম গাফিলতি, নিম্নমানের কাজ অনুমোদন, ঠিকাদারদের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা এবং দপ্তরের ভেতরে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদার সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও বিল ছাড় দেওয়া, নকশা ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল না থাকা এবং প্রকল্প তদারকিতে ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা ছিল নিয়মিত চিত্র। এসব অভিযোগ লিখিত ও মৌখিকভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গেলেও সেগুলো রহস্যজনকভাবে কখনোই আলোর মুখ দেখেনি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই অদ্ভুত দায়মুক্তির পেছনে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়। মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ আওয়ামীপন্থী বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, এই সংগঠনের ছত্রছায়াতেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে অদৃশ্য সুরক্ষা পেয়ে আসছেন। দপ্তরের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তা কার্যত নিষ্পত্তিহীন ফাইলে পরিণত হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তা আর হয় না, আর হলেও রিপোর্ট প্রকাশ পায় না।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শাহ্ নইমুল কাদেরকে আহ্বায়ক এবং প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদারকে সদস্যসচিব করে ১৯ সদস্যের বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—সরকারি দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কীভাবে একটি রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেন? প্রশাসনিক বিধিমালার সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও মেলেনি।
এরপরও বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০২৩–২৪ সালের আহ্বায়ক কমিটিতেও মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ স্বগৌরবে সদস্য হিসেবে থেকে যান। অর্থাৎ টানা দুই মেয়াদে তিনি একই রাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অবস্থান করছেন, অথচ একই সময়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীল নির্বাহী প্রকৌশলী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এই দ্বৈত ভূমিকা যে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে, সে বিষয়ে দপ্তরের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব।
এই নীরবতার সুযোগ নিয়েই অভিযোগ উঠেছে, মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ তাঁর অবস্থানকে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে ব্যবহার করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় তাঁর নামে অথবা ঘনিষ্ঠজনদের নামে একটি ফ্ল্যাটসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাব, গাড়ি ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পদের তথ্যও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উঠে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বৈধ বেতনের আয়ে এত সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব? সম্পদের উৎস কী? এসব সম্পদ কি নিয়মিত আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত হয়েছে?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ যাচাইয়ে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দুদকের নীরবতা বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ সরকারি প্রকৌশল খাত দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতিপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। অথচ একাধিক অভিযোগ, সম্পদের তথ্য এবং প্রশাসনিক অনিয়মের আলামত থাকা সত্ত্বেও মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান শুরু হয়নি—যা সাধারণ মানুষের চোখে দুদকের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ তৈরি করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, দপ্তরের ভেতরে একটি অলিখিত নিয়ম চালু হয়ে গেছে—যাঁরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলাই ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযোগ তুললে বদলি, অবমূল্যায়ন বা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক সৎ কর্মকর্তা মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে দপ্তরের ভেতরে ভয় ও হতাশার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ধ্বংস করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে যদি এভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে, তবে দেশের শিক্ষা অবকাঠামোর মান ও নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ভবন নির্মাণে অনিয়ম মানে সরাসরি শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি। এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “নিউজ করে হয়রানি করার কি দরকার? সেগুনবাগিচায় আমার কোনো ফ্ল্যাট নেই। আর প্রধান প্রকৌশলী এ ধরনের কমিটির অনুমোদন দিতে পারেন না। আশা করি যাচাই-বাছাই করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করবেন।” তবে তাঁর এই বক্তব্য নতুন প্রশ্নও তুলেছে। যদি প্রধান প্রকৌশলী অনুমোদন দিতে না পারেন, তাহলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি কীভাবে অনুমোদন পেল? আর যদি তিনি সদস্য না হন, তাহলে টানা দুই মেয়াদের আহ্বায়ক কমিটিতে তাঁর নাম কীভাবে রয়েছে?
আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ পরিচিত মহলে নিজেকে কখনো বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা, আবার কখনো ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিএনপির ত্যাগী নেতাদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে—ছাত্রদলের রাজনীতি করা একজন ব্যক্তি কীভাবে আওয়ামীপন্থী বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন? এটি কি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আরেকটি উদাহরণ, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিচয় বদলের কৌশল?
সব মিলিয়ে মুজাহিদুল ইসলাম আলিফকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্নগুলো এখন আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ততা এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি বড় পরীক্ষা। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের হিসাব যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ইইডি যে দুর্নীতির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে—সে আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ এভাবে উপেক্ষিত থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়বে। প্রশ্ন এখন একটাই—মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ কি সত্যিই আইনের ঊর্ধ্বে, নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে আছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















