ঢাকা ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়

গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (গাজীউক) ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ মুরাদ আলী খানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখন প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগের পরিমাণ ও গভীরতা এতটাই বিস্তৃত যে, এটি আর ব্যক্তিগত দুর্নীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গাজীপুর নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চিত্রই এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ড্যাপের নীতিমালা লঙ্ঘন করে জলাশয় ভরাট, বহুতল ভবনের অবৈধ নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান, ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায় এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো একের পর এক অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর মৌজার ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১৩ তলা ভবন নির্মাণে সরাসরি সহযোগিতা করেন ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান। অভিযোগ রয়েছে, ওই জলাশয়ের ওপর ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র তৈরিতে তিনি নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেন। সিএস ৮৭৫ (অংশ) ও আরএস ২৪৫৩ (অংশ) দাগভুক্ত, খন্দকার নাজিমউদ্দিন গং-এর নামে মহানগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বারুদা এলাকায় প্রায় ৩৬ শতাংশ জমির ওপর জলাশয় থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ সেই আইন ও পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে একের পর এক অবৈধ নকশা অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে জলাশয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত, সেটি এখন ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম এলেই আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে।

একইভাবে গাজীপুর মহানগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছায়াবিথী এলাকায় বেজমেন্টসহ ১০ তলা একটি ভবনের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া হয় আক্তারুজ্জামান শুকুর গং-এর নামে। অভিযোগ রয়েছে, এই এলাকাটিও ড্যাপে জলাশয় ও পরিবেশ সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তবুও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়, যা স্পষ্টতই পরিকল্পিত অনিয়মের অংশ।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয়ের আশপাশে আরও একাধিক বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন ও ভূমি ছাড়পত্র দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মুরাদ আলী খান। প্রতিটি ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি একটি বিশেষ সংকেত ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতিটি ভবন নির্মাণ ফাইলে তিনি হাতে লেখা ‘এম’ চিহ্ন দিয়ে দিতেন। এই ‘এম’ চিহ্নের অর্থ ‘মুরাদ’। তার এই চিহ্ন ছাড়া কোনো ফাইলই নাকি অনুমোদনের টেবিল পেরোতে পারত না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ছিল ঘুষ লেনদেনের একটি সংকেতিক পদ্ধতি।

সূত্র মতে, প্রতিটি ফাইল অনুমোদনের বিপরীতে তিনি লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন। ফাইলের প্রকৃতি, ভবনের উচ্চতা ও জমির অবস্থান অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হতো। অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বা জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে তার দাবি মেনে নিতে হতো, অন্যথায় ফাইল আটকে রাখা হতো মাসের পর মাস। এতে একদিকে যেমন অবৈধ নির্মাণ বৈধতা পাচ্ছিল, অন্যদিকে নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছিল।

এই বিপুল অবৈধ আয়ের মাধ্যমেই ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান অল্প সময়ের মধ্যে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে তার নামে ও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট ও জমির তথ্য পাওয়া গেছে।

তথ্যানুসারে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা নলজানি গ্রেটওয়াল সিটি বাজারের অপর পাশে নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবনে মুরাদ আলীর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফ্ল্যাট তিনি কৌশলে নিজের বোন ও স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করে রেখেছেন, যাতে তার নাম সরাসরি সামনে না আসে।

এছাড়া গাজীপুর সিটির চৌরাস্তা এলাকার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে পালের মাঠ শহীদ বরকত সরণী রোডে তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন, পিতা আশরাফুল আলম খান ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনিসুর রহমানের নামে তিনটি আলিশান বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ভবন গাজীপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও মূল্যবান এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রতি তলা থেকে বিপুল পরিমাণ ভাড়া আয় হয়।

নলজানি ৭ নম্বর রোডের সি ব্লকে গণসেবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অপর পাশে নির্মাণাধীন দুটি ১০ তলা ভবনের দুটি ফ্লোর রয়েছে মুরাদ আলীর নামে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, ভবন দুটি নির্মাণের সময় বিভিন্ন নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কোনো ধরনের বাধা আসেনি, যা তার প্রভাবশালী অবস্থানকেই নির্দেশ করে।

এছাড়াও সানরাইজ টাওয়ারের ঠিক অপরপাশে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ২৯ শতাংশ জমি কিনেছেন তিনি। তবে কৌশলে এই জমিটি তার বোনের নামে কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা বলে জানা গেছে। দলিল নম্বর ৬৯৫/২৫ অনুযায়ী, এই জমিতে বর্তমানে একটি কাপড়ের গোডাউন রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গাজীপুর ডুয়েটের অপর পাশে পশ্চিম ভুরুলিয়া সাত্তার সরণী (রাঙ্গামাটি নীড়) রোডের শেষ মাথায় একটি পাঁচ তলা ভবন নির্মাণ করছেন মুরাদ আলী খান। একই এলাকায় অবস্থিত একটি সাত তলা ভবনে তার নামে ২ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবনটির নাম মিতালি ভবন। এলাকাবাসীর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক ইমারত পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগ রাজউকে কর্মরত থাকা অবস্থায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় বেশ কয়েকটি ভবনের মালিক হয়েছেন। তারা দাবি করেন, গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে মুরাদ আলী খান ও কামরুল হাসান সোহাগের মধ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে অবৈধ নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্র বাণিজ্য পরিচালিত হতো।

এ বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান ও নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এবং সচিব মোহাম্মদ মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে আমাদের মাতৃভূমির পক্ষ থেকে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে লিখিতভাবে পত্র প্রেরণ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা লিখিত মতামত পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গাজীপুরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ ধ্বংস এবং অব্যবস্থাপনার পেছনে এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সচেতন মহলের মতে, একজন ইমারত পরিদর্শকের এমন লাগামহীন ক্ষমতা প্রয়োগ শুধু দুর্নীতিকেই উসকে দেয় না, বরং পুরো উন্নয়ন কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। গাজীপুরের মতো দ্রুত বর্ধনশীল নগরীতে যদি পরিকল্পনা আইনকে এভাবে ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মুরাদ আলী খান ও তার সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব তলব, অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। নতুবা গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থা আরও একধাপ কমে যাবে।

প্রতিবেদকের কাছে মুরাদ আলী খানের আরও সম্পদের তথ্য ও অনিয়ম সংক্রান্ত নথি রয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়

আপডেট সময় ০১:২১:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (গাজীউক) ইমারত পরিদর্শক মোহাম্মদ মুরাদ আলী খানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখন প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগের পরিমাণ ও গভীরতা এতটাই বিস্তৃত যে, এটি আর ব্যক্তিগত দুর্নীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং গাজীপুর নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চিত্রই এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ড্যাপের নীতিমালা লঙ্ঘন করে জলাশয় ভরাট, বহুতল ভবনের অবৈধ নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান, ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায় এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো একের পর এক অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর মৌজার ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে ১৩ তলা ভবন নির্মাণে সরাসরি সহযোগিতা করেন ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান। অভিযোগ রয়েছে, ওই জলাশয়ের ওপর ভবন নির্মাণের জন্য নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র তৈরিতে তিনি নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেন। সিএস ৮৭৫ (অংশ) ও আরএস ২৪৫৩ (অংশ) দাগভুক্ত, খন্দকার নাজিমউদ্দিন গং-এর নামে মহানগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বারুদা এলাকায় প্রায় ৩৬ শতাংশ জমির ওপর জলাশয় থাকা সত্ত্বেও কাগজে-কলমে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ সেই আইন ও পরিকল্পনাকে উপেক্ষা করে ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে একের পর এক অবৈধ নকশা অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে জলাশয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত, সেটি এখন ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম এলেই আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে পানিতে।

একইভাবে গাজীপুর মহানগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছায়াবিথী এলাকায় বেজমেন্টসহ ১০ তলা একটি ভবনের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদন দেওয়া হয় আক্তারুজ্জামান শুকুর গং-এর নামে। অভিযোগ রয়েছে, এই এলাকাটিও ড্যাপে জলাশয় ও পরিবেশ সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তবুও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়, যা স্পষ্টতই পরিকল্পিত অনিয়মের অংশ।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ড্যাপে চিহ্নিত জলাশয়ের আশপাশে আরও একাধিক বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন ও ভূমি ছাড়পত্র দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মুরাদ আলী খান। প্রতিটি ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি একটি বিশেষ সংকেত ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতিটি ভবন নির্মাণ ফাইলে তিনি হাতে লেখা ‘এম’ চিহ্ন দিয়ে দিতেন। এই ‘এম’ চিহ্নের অর্থ ‘মুরাদ’। তার এই চিহ্ন ছাড়া কোনো ফাইলই নাকি অনুমোদনের টেবিল পেরোতে পারত না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ছিল ঘুষ লেনদেনের একটি সংকেতিক পদ্ধতি।

সূত্র মতে, প্রতিটি ফাইল অনুমোদনের বিপরীতে তিনি লাখ লাখ টাকা আদায় করতেন। ফাইলের প্রকৃতি, ভবনের উচ্চতা ও জমির অবস্থান অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হতো। অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বা জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে তার দাবি মেনে নিতে হতো, অন্যথায় ফাইল আটকে রাখা হতো মাসের পর মাস। এতে একদিকে যেমন অবৈধ নির্মাণ বৈধতা পাচ্ছিল, অন্যদিকে নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ছিল।

এই বিপুল অবৈধ আয়ের মাধ্যমেই ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান অল্প সময়ের মধ্যে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে তার নামে ও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে একাধিক বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট ও জমির তথ্য পাওয়া গেছে।

তথ্যানুসারে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা নলজানি গ্রেটওয়াল সিটি বাজারের অপর পাশে নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবনে মুরাদ আলীর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফ্ল্যাট তিনি কৌশলে নিজের বোন ও স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করে রেখেছেন, যাতে তার নাম সরাসরি সামনে না আসে।

এছাড়া গাজীপুর সিটির চৌরাস্তা এলাকার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে পালের মাঠ শহীদ বরকত সরণী রোডে তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন, পিতা আশরাফুল আলম খান ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনিসুর রহমানের নামে তিনটি আলিশান বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ভবন গাজীপুর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও মূল্যবান এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রতি তলা থেকে বিপুল পরিমাণ ভাড়া আয় হয়।

নলজানি ৭ নম্বর রোডের সি ব্লকে গণসেবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অপর পাশে নির্মাণাধীন দুটি ১০ তলা ভবনের দুটি ফ্লোর রয়েছে মুরাদ আলীর নামে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, ভবন দুটি নির্মাণের সময় বিভিন্ন নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কোনো ধরনের বাধা আসেনি, যা তার প্রভাবশালী অবস্থানকেই নির্দেশ করে।

এছাড়াও সানরাইজ টাওয়ারের ঠিক অপরপাশে পার্টনারশিপের মাধ্যমে ২৯ শতাংশ জমি কিনেছেন তিনি। তবে কৌশলে এই জমিটি তার বোনের নামে কেনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা বলে জানা গেছে। দলিল নম্বর ৬৯৫/২৫ অনুযায়ী, এই জমিতে বর্তমানে একটি কাপড়ের গোডাউন রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

গাজীপুর ডুয়েটের অপর পাশে পশ্চিম ভুরুলিয়া সাত্তার সরণী (রাঙ্গামাটি নীড়) রোডের শেষ মাথায় একটি পাঁচ তলা ভবন নির্মাণ করছেন মুরাদ আলী খান। একই এলাকায় অবস্থিত একটি সাত তলা ভবনে তার নামে ২ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবনটির নাম মিতালি ভবন। এলাকাবাসীর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক ইমারত পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগ রাজউকে কর্মরত থাকা অবস্থায় ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় বেশ কয়েকটি ভবনের মালিক হয়েছেন। তারা দাবি করেন, গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে মুরাদ আলী খান ও কামরুল হাসান সোহাগের মধ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে অবৈধ নকশা অনুমোদন ও ছাড়পত্র বাণিজ্য পরিচালিত হতো।

এ বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলী খান ও নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এবং সচিব মোহাম্মদ মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে আমাদের মাতৃভূমির পক্ষ থেকে রেজিস্টার্ড ডাকযোগে লিখিতভাবে পত্র প্রেরণ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা লিখিত মতামত পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গাজীপুরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ ধ্বংস এবং অব্যবস্থাপনার পেছনে এ ধরনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সচেতন মহলের মতে, একজন ইমারত পরিদর্শকের এমন লাগামহীন ক্ষমতা প্রয়োগ শুধু দুর্নীতিকেই উসকে দেয় না, বরং পুরো উন্নয়ন কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। গাজীপুরের মতো দ্রুত বর্ধনশীল নগরীতে যদি পরিকল্পনা আইনকে এভাবে ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মুরাদ আলী খান ও তার সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব তলব, অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। নতুবা গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের আস্থা আরও একধাপ কমে যাবে।

প্রতিবেদকের কাছে মুরাদ আলী খানের আরও সম্পদের তথ্য ও অনিয়ম সংক্রান্ত নথি রয়েছে, যা যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।