বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে মফস্বল ও শহরতলির প্রতিটি হাটবাজারে হাজার হাজার মুদি দোকান প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করছে।অথচ এসব দোকানের অধিকাংশেরই নেই বৈধ ট্রেড লাইসেন্স। স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলা, তদারকির অভাব এবং অসচেতনতা বা ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার কারণে সরকার প্রতিবছর হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মুদি দোকানের ক্ষেত্রে সঠিক লাইসেন্স ব্যবস্থা থাকলে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে পারতো।
ট্রেড লাইসেন্স কি এবং কেন এটি প্রয়োজনীয়
ট্রেড লাইসেন্স একটি ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র, যা সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়। এটি ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি বাধ্যতামূলক দস্তাবেজ, যা সরকারের নিকট ব্যবসাটি নিবন্ধিত এবং আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে—এ কথা প্রমাণ করে।
লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর একটি নির্দিষ্ট ফি আরোপ করে এবং এ ফি সরকারী কোষাগারে জমা পড়ে। এটি ব্যবসার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং একই সাথে সরকারী রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
গ্রামীণ হাটবাজারের চিত্র
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামীণ হাটবাজারে প্রায় ৮০%-৯০% মুদি দোকানের কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই। যেমন:
রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার উপজেলার একটি বাজারে ৭২টি মুদি দোকানের মধ্যে মাত্র ১১টির ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে।
রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার একটি হাটে ৫৩টির মধ্যে লাইসেন্সধারী মাত্র ৭টি মুদি দোকান।
এই চিত্র সারাদেশেই কম-বেশি একই রকম। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের একটি বড় উৎস কার্যত অপচয়ে পরিণত হচ্ছে।
কারণসমূহ
১. স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা:
অনেক ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা সঠিকভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের উদ্যোগ নেয় না।
দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব:
কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া লাইসেন্স নবায়নে অনৈতিক সুবিধা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
সচেতনতার অভাব:
অনেক দোকানদার জানেন না যে ট্রেড লাইসেন্স একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা। আবার কেউ কেউ জানলেও মনে করেন এটি শুধু শহরাঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য।
নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থাপনা:
স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেগুলোকে নিয়মের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
ট্রেড লাইসেন্স বাবদ একজন দোকানদারের কাছ থেকে সরকার বছরে গড়ে ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব পেতে পারে, যা বাজারভেদে ভিন্ন হতে পারে। সারা দেশে অনুমানিক ১০ লাখের বেশি লাইসেন্সবিহীন মুদি দোকান আছে বলে ধরে নিলে:
১,০০০,০০০ দোকান × গড় লাইসেন্স ফি ১,০০০ টাকা = ১০০ কোটি টাকা সরাসরি রাজস্ব
এছাড়া লাইসেন্স থাকা মানে ব্যবসা রেজিস্ট্রেশন, ভ্যাট বা আয়কর ফাইলে অন্তর্ভুক্তি—যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব নিশ্চিত করা যেতো।
সমাধান ও সুপারিশ
১. ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন প্ল্যাটফর্ম:
প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানদাররা যেন মোবাইল অ্যাপ বা সহজ অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স করতে পারে, এমন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা দরকার।
জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি:
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় এনজিওগুলোকে নিয়ে ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে—”লাইসেন্স করো, ব্যবসা উন্নত করো” স্লোগানে।
প্রণোদনা ভিত্তিক লাইসেন্সিং:
নতুন ব্যবসা লাইসেন্স করলে কর রেয়াত, প্রশিক্ষণ সুবিধা, ক্ষুদ্র ঋণ—এমন সুবিধা দিয়ে লাইসেন্স পেতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
আইনগত ব্যবস্থা:
লাইসেন্স না থাকলে নির্দিষ্ট জরিমানা এবং পর্যায়ক্রমে ব্যবসা স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত হচ্ছে অর্থনীতির প্রাণভোমরা। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের অব্যবস্থা, তদারকির ঘাটতি ও নীতিনির্ধারকদের নজরদারির অভাবে এই খাত থেকে সরকার হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। জরুরি ভিত্তিতে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থাকে ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও গ্রামমুখী না করলে রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি ব্যবসার স্বীকৃতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এখনই সময়—গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সবাইকে একই কাঠামোর আওতায় এনে ব্যবসা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার।
শহিদুল ইসলাম
লেখক ও কালামিস্ট
শহীদুল ইসলাম বিশেষ প্রতিনিধি 

























