মোঃ ইউসুফ, সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
২০২৪ সালের জুলাই মাস, দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যা ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের অংশীদার ছিলেন একজন দূরদর্শী, সাহসী এবং নীতিনিষ্ঠ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ শওকাত আলী। আন্দোলনের সময় ছাত্রদের উপর তৎকালীন প্রশাসনের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এর প্রতিবাদে অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে নেমে পড়েন রাজপথে। ড. শওকাত আলীর নেতৃত্ব ছিল রাজনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চেতনার পুনর্জাগরণের এক বলিষ্ঠ নিদর্শন। তিনি বুঝেছিলেন, পরিবর্তন আনতে হলে কেবল আদর্শ প্রচার করলেই হবে না, তার বাস্তবায়নেও থাকতে হবে শক্ত অবস্থান। শিক্ষা, জবাবদিহিতা, এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন অনমনীয়। ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলে সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একপ্রকার অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়ে এরই ধারাবাহিকতায় আঠারো সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী শিক্ষক ড. মোঃ শওকাত আলীকে জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বিশ্ববিদ্যালয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার স্মৃতি বিজড়িত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক নবজাগরণের পথে এগিয়ে চলেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি প্রধান কেন্দ্র বিন্দু। ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিদ্যাপীঠের উন্নয়ন যাত্রা যেন নতুন করে গতিময় হয়ে উঠেছে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ডঃ মোঃ শওকাত আলীর বলিষ্ঠ , দূরদর্শী এবং কর্মমুখী নেতৃত্বে।
ড. শওকাত আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম এবং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও লক্ষ্যনির্ধারণ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন চিত্র এখন আরও সুদৃশ্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে এর একাডেমিক কাঠামো ও শিক্ষার মান। ড. শওকাত আলী শুরু থেকেই এই দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। পাঠদান প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সেশনজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ এবং নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করা তাঁর প্রশাসনিক নীতির অন্যতম ভিত্তি। তিনি নিয়মিত একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক করে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করছেন এবং শিক্ষকদের মধ্যে একটি গবেষণামুখী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উৎসাহ দিচ্ছেন। উৎসাহ প্রদান ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার হার বাড়াতে গবেষণা অনুদান, ফান্ডিং এবং সেমিনার আয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন। ইতিমধ্যে অনেক শিক্ষক দেশের বাইরেও গবেষণা কাজে অংশ নিচ্ছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বড় অর্জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চেহারা বদলে দিতে হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। ড. শওকাত আলী এই বিষয়েও একদম শুরুর দিকে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। ১১ শত কোটি টাকার একটি মাস্টার পরিকল্পনা ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও সবুজ ও পরিচ্ছন্ন করতে সবুজায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারকে আরো আধুনিকায়ন এবং আইসিটি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে যা ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত করবে। বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অনিবার্য।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে উপাচার্য নিয়মিত মতবিনিময়ের আয়োজন করছেন। এতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানও মিলছে অনেক ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে প্রশাসন, শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা যদি বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য না হয়, তবে তা অপূর্ণই থেকে যায়। ড. শওকাত আলী এই বিষয়টি বিশেষভাবে উপলব্ধি করে শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে যোগসূত্র গড়ার চেষ্টা করছেন। তিনি বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, আইটি কোম্পানি, গবেষণা সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। ক্যারিয়ার সেলকে আরও শক্তিশালী করে শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ আর কেবল দেশের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বৈশ্বিক সংযোগ আবশ্যক। ড. শওকাত আলীর নেতৃত্বে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করেছে এবং একাডেমিক, গবেষণা ও ছাত্র বিনিময় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানে শিক্ষা লাভের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রফেসর ড. মোঃ শওকাত আলীর দূরদর্শী পরিকল্পনা, সততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আজ একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল অবকাঠামোগতভাবে নয়, বরং নৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেও এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর কর্মকাণ্ড শুধু উত্তরাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের নয়, গোটা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন আশার সঞ্চার করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, এবং শিক্ষার গুণগত মান—এই তিনটি স্তম্ভে তিনি সংস্কার এনেছেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন আদর্শ স্থাপন করেছে। ‘জুলাই বিপ্লব’ ছিল শুধুই একটি ঘটনার নাম নয়; এটি ছিল এক মানসিক ও নৈতিক জাগরণের সূত্রপাত। ড. শওকাত আলীর মতো শিক্ষকরা যুগে যুগে প্রমাণ করে যান যে, সৎ উদ্দেশ্য, প্রজ্ঞা এবং সাহসিকতা থাকলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান, যে কোনো সমাজ, এমনকি একটি দেশও পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
শহীদুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি 

























