প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে দাঁড়িয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ। মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যান প্রধানমন্ত্রী।
ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন নিখিল। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর এই ভূমিকা স্বাভাবিক মনে হলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর দলীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিখিল কুমার নাথ রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী পরিষদের সদস্য। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী হাছান মাহমুদের নির্বাচনি এলাকা রাঙ্গুনিয়ার রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত তিনি। স্থানীয় রাজনীতিতে হাছান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও আলোচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সরকারি বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বও পেয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন নেতার সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী। তাঁদের প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন সুবিধা ও পদ পাওয়া একজন ব্যক্তি কীভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন।
তবে নিখিল কুমার নাথের দাবি, পূজা উদযাপন পরিষদের দায়িত্বশীল নেতা হিসেবেই তিনি অনুষ্ঠানে এই ভূমিকা পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করলেও তিনি দাবি করেন, কখনো কারও কোনো ক্ষতি করেননি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি গণমাধ্যমকে নিখিল কুমার নাথ বলেন, ‘বিএনপির লোকেরা আমাকে ভালোবাসেন। আমাদের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। তিনি তো সবার। সে হিসেবে আমাদেরও। এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবিটি আওয়ামী লীগ এলে কেউ যদি দেখিয়ে বলে আমি বিএনপি করতাম, তাহলে কী শোভা পায়?’
নিখিল কুমার নাথ পেশায় চট্টগ্রামের একজন আইনজীবী। পূজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। ২০২১ সালের ২২ জুন প্রকাশিত স্থানীয় একটি সংবাদ অনুযায়ী, তাঁকে উত্তর রাঙ্গুনিয়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় তিনি চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং উত্তর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
ছাত্রজীবনেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। উত্তর জেলা ছাত্রলীগ, আইন কলেজ ছাত্রলীগ এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা, ইউনিয়ন ও কলেজ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
পরবর্তী সময়ে তিনি পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক হন। মঙ্গলবার জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই সাংগঠনিক পরিচয়েই তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে নিখিল কুমার নাথের উপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রশ্ন তুলেছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের পাঠাগার সম্পাদক মাসুদ উল হক চৌধুরী। তাঁর পোস্টের মূল প্রশ্ন ছিল, ‘প্রধানমন্ত্রীর পাশে আওয়ামী লীগ নেতা কীভাবে?’
পোস্টে মাসুদ উল হক চৌধুরী দাবি করেন, নিখিল কুমার নাথ শুধু রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যই নন, আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো মেয়াদে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ কারণে তাঁকে তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে ছাত্রদলের এই নেতা আরও বলেন, এমন রাজনৈতিক পরিচয়ের একজনকে প্রধানমন্ত্রীর এত কাছাকাছি রেখে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো কীভাবে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর নজরে আনারও আহ্বান জানান তিনি।
নিখিল কুমার নাথের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। হাছান মাহমুদ দীর্ঘ সময় রাঙ্গুনিয়া আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওই এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় নিখিল নাথ তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয়ের একজন হিসেবে পরিচিতি পান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তৎকালীন মন্ত্রী হাছান মাহমুদের আধা সরকারি পত্রের ভিত্তিতেই নিখিল কুমার নাথ উত্তর রাঙ্গুনিয়া কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদ পেয়েছিলেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি শুধু জানান, বর্তমানে একটি বৈঠকে ব্যস্ত রয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















