ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কুমিল্লায় গৃহবধূ মরিয়ম বেগম হত্যায় শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের যাবজ্জীবন শিবগঞ্জে ১৮৫ গ্রাম হেরোইনসহ চারজন গ্রেপ্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির অভিযানে ১৩০ বোতল এস্কাফ সিরাপ জব্দ দেশে বিনা চিকিৎসায় আর রুগীর মৃত্যু দেখতে চাই না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কুমিল্লায় বিজিবির অভিযানে  ৯২ লাখ টাকার অবৈধ ভারতীয় শাড়ি-থ্রিপিস উদ্ধার পাগলাপীরের ঠাকুরপাড়ায় মাইক্রোবাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষ,দুই বন্ধুর মৃত্যু ডাবল সুবিধা’ নিতে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ, যুব উন্নয়নের সাবেক ডিজির বিরুদ্ধে এলজিইডিতে পদোন্নতি-বদলি ও নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে শফিকুর রহমান ইইডির শীর্ষ পদ দখলের দৌড়, পদোন্নতি-ঠিকাদারি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে অস্থিরতা পিরোজপুরে এলজিইডিতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কাগজে কাজ দেখিয়ে ১১০০ কোটি লোপাট

পিরোজপুরে এলজিইডিতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কাগজে কাজ দেখিয়ে ১১০০ কোটি লোপাট

পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আবার বাস্তবে থাকা স্থাপনাকেও কাগজে ‘নেই’ দেখিয়ে একই স্থানে নতুন করে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এভাবে ভুয়া দরপত্র ও কাগজপত্রের কারসাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এলজিইডির নথি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পিরোজপুর জেলায় ১১টি প্রকল্পে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার বিল পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি প্রায় ১ হাজার ১০১ কোটি টাকার কাজ ও ব্যয়ের সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এলজিইডির কর্মকর্তাদের দাবি, কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়া এবং অনিয়মের তথ্য গোপন করতে নথিপত্র সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করার ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী।

কাগজে কাজ, বাস্তবে নেই

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পে গুরুতর অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে আড়াগুলগড় (পূর্ব শিয়ালকাঠী থেকে মলিয়ার হাট ডিস্ট্রিক্ট রোড) সড়কের একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়নও দেওয়া হয়েছিল। পরে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তারা সেখানে কোনো কাজই হয়নি বলে দেখতে পান। অথচ প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

একইভাবে ভাণ্ডারিয়া-চরখালী সড়কের একটি অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ৮২ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে সেখানে কাজ না পাওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

ভাণ্ডারিয়া পূর্ব দাওয়া রোডে ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ব্রিজের কাজ মাত্র ১৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে ৮০ শতাংশ বিল পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সরেজমিনে কোনো ব্রিজ নির্মাণের কাজই হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়কের একটি অংশে দুই কিলোমিটারের বেশি বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ৯৫ শতাংশ অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সরেজমিনে কোনো কাজ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একই সড়কে একাধিক প্রকল্প
তদন্তে একই সড়কে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

বরিশাল বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়ক থেকে তালুকদার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হয়। অথচ এর আগের একটি প্রকল্পের আওতায় একই সড়কে চারটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কয়েকটি বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থের হিসাব নেই
‘দক্ষিণাঞ্চলের জেলার সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে’ পিরোজপুরে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪০৬ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেলেও বাকি ২১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার কাজের কোনো সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

‘পিরোজপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ তিন বছরে ৬২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘বরিশাল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে’ পিরোজপুর জেলায় ৩৬০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও মাত্র ১০১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ‘সার্বভৌম মূল্যায়ন ও কন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ২৭৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৭১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাজের হিসাব, ‘উপজেলা টাউন (নন-পৌরসভা) মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন এবং মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২১ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

‘গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ ৭১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজের হিসাব রয়েছে। ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ প্রকল্পে’ ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ছাড় হলেও হিসাব পাওয়া গেছে ৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকার।

এ ছাড়া ‘বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ‘দেশব্যাপী পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পে’ ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে এমনভাবে প্রকল্পের বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রকল্পের ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পর্যন্ত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

বই, বিল রেজিস্টার, চেক রেজিস্টার, অর্থ ছাড়ের পত্র (ডিও), পরিমাপ বই, ব্যাংক চালান ও ব্যাংক হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিরও ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে। ২২৫টি প্যাকেজের মধ্যে ১২টির কাজ শুরুই হয়নি এবং ১২১টি প্যাকেজের কাজ চলমান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে।

সচিবালয়ে আগুনের পর তদন্তে গতি
সচিবালয়ে আগুন লাগার পর পিরোজপুর এলজিইডির দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে পিরোজপুরের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ লুটপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাবেক মুখ্য সচিবের প্রাথমিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়।

এরপর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়। মন্ত্রণালয় থেকেও পৃথক তদন্ত করা হয়।

দায় নিতে নারাজ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা
এলজিইডির পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, প্রকল্প পরিচালক মূলত বিল পরিশোধ করেন। অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর। তাই এসব অনিয়মের দায় তাঁর নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) গোলাম কৃপা দেওয়ান কাদের বলেন, পিরোজপুরের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও পৃথক তদন্ত করেছে।

তিনি বলেন, “এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিরোজপুরে অনিয়মের বিষয়টি এলজিইডিই আগে জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করা হয়েছে।

পিরোজপুর এলজিইডির এসব প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কত টাকার কাজ হয়েছে এবং কত টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, দরপত্র নথি, কাজের পরিমাপ ও সরেজমিন বাস্তবায়ন যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুমিল্লায় গৃহবধূ মরিয়ম বেগম হত্যায় শ্বশুর-শাশুড়ি ও দেবরের যাবজ্জীবন

পিরোজপুরে এলজিইডিতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কাগজে কাজ দেখিয়ে ১১০০ কোটি লোপাট

আপডেট সময় ০৩:২৩:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ না করেই কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আবার বাস্তবে থাকা স্থাপনাকেও কাগজে ‘নেই’ দেখিয়ে একই স্থানে নতুন করে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এভাবে ভুয়া দরপত্র ও কাগজপত্রের কারসাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এলজিইডির নথি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পিরোজপুর জেলায় ১১টি প্রকল্পে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার বিল পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি প্রায় ১ হাজার ১০১ কোটি টাকার কাজ ও ব্যয়ের সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এলজিইডির কর্মকর্তাদের দাবি, কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়া এবং অনিয়মের তথ্য গোপন করতে নথিপত্র সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করার ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী।

কাগজে কাজ, বাস্তবে নেই

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পে গুরুতর অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে আড়াগুলগড় (পূর্ব শিয়ালকাঠী থেকে মলিয়ার হাট ডিস্ট্রিক্ট রোড) সড়কের একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়নও দেওয়া হয়েছিল। পরে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তারা সেখানে কোনো কাজই হয়নি বলে দেখতে পান। অথচ প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।

একইভাবে ভাণ্ডারিয়া-চরখালী সড়কের একটি অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ৮২ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে সেখানে কাজ না পাওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

ভাণ্ডারিয়া পূর্ব দাওয়া রোডে ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ব্রিজের কাজ মাত্র ১৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে ৮০ শতাংশ বিল পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সরেজমিনে কোনো ব্রিজ নির্মাণের কাজই হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়কের একটি অংশে দুই কিলোমিটারের বেশি বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ৯৫ শতাংশ অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ সরেজমিনে কোনো কাজ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একই সড়কে একাধিক প্রকল্প
তদন্তে একই সড়কে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

বরিশাল বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়ক থেকে তালুকদার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হয়। অথচ এর আগের একটি প্রকল্পের আওতায় একই সড়কে চারটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কয়েকটি বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থের হিসাব নেই
‘দক্ষিণাঞ্চলের জেলার সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে’ পিরোজপুরে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪০৬ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেলেও বাকি ২১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার কাজের কোনো সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

‘পিরোজপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ তিন বছরে ৬২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘বরিশাল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে’ পিরোজপুর জেলায় ৩৬০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও মাত্র ১০১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ‘সার্বভৌম মূল্যায়ন ও কন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ২৭৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৭১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাজের হিসাব, ‘উপজেলা টাউন (নন-পৌরসভা) মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন এবং মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২১ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে।

‘গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ ৭১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজের হিসাব রয়েছে। ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ প্রকল্পে’ ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ছাড় হলেও হিসাব পাওয়া গেছে ৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকার।

এ ছাড়া ‘বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ‘দেশব্যাপী পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পে’ ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে এমনভাবে প্রকল্পের বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রকল্পের ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পর্যন্ত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

বই, বিল রেজিস্টার, চেক রেজিস্টার, অর্থ ছাড়ের পত্র (ডিও), পরিমাপ বই, ব্যাংক চালান ও ব্যাংক হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিরও ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে। ২২৫টি প্যাকেজের মধ্যে ১২টির কাজ শুরুই হয়নি এবং ১২১টি প্যাকেজের কাজ চলমান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে।

সচিবালয়ে আগুনের পর তদন্তে গতি
সচিবালয়ে আগুন লাগার পর পিরোজপুর এলজিইডির দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে পিরোজপুরের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ লুটপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাবেক মুখ্য সচিবের প্রাথমিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়।

এরপর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়। মন্ত্রণালয় থেকেও পৃথক তদন্ত করা হয়।

দায় নিতে নারাজ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা
এলজিইডির পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, প্রকল্প পরিচালক মূলত বিল পরিশোধ করেন। অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর। তাই এসব অনিয়মের দায় তাঁর নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) গোলাম কৃপা দেওয়ান কাদের বলেন, পিরোজপুরের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও পৃথক তদন্ত করেছে।

তিনি বলেন, “এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিরোজপুরে অনিয়মের বিষয়টি এলজিইডিই আগে জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করা হয়েছে।

পিরোজপুর এলজিইডির এসব প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কত টাকার কাজ হয়েছে এবং কত টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, দরপত্র নথি, কাজের পরিমাপ ও সরেজমিন বাস্তবায়ন যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।