ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পিরোজপুরে এলজিইডিতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কাগজে কাজ দেখিয়ে ১১০০ কোটি লোপাট উজিরপুরে সড়ক অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনা চাপা দিতে প্রকৌশলী সুব্রতের তৎপরতা কর্ণফুলীতে খাল খননে পিআইওর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ডোমারে বিএডিসির কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রকল্প পরিচালকের আড়ালে দুর্নীতি চক্রের হোতা, হাতিয়েছেন কোটি টাকা কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ডিজি রেজওয়ানুরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বিআরটিএর কর্মকর্তা হারুন অনিয়মের অভিযোগে বদলি নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন মুশিউর রহমান, ওএসডি সন্ধ্যার মধ্যে ছয় জেলায় ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কবার্তা আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাথমিক ভূমি পরিদর্শন

প্রকল্প পরিচালকের আড়ালে দুর্নীতি চক্রের হোতা, হাতিয়েছেন কোটি টাকা

দেশের সরকারি-বেসরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বহুমাত্রিক দুর্নীতি শুধু ব্যাধিই নয়, সরকারি কাঠামোয় ক্ষয় ধরিয়েছে। দুর্নীতির ক্ষত উপশমের লক্ষ্যে প্রতিটি সরকারের তরফেই দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের পাশাপাশি দৃশ্যমান পদক্ষেপ সত্ত্বেও দুর্নীতির অপছায়া সরানো যে কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলে এরই কদর্য নজির স্থাপন করেছে চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তর নির্মাণ ঘিরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোভ ও অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি হয়। ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের বিধিবিধান ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেয়া হলো দুর্নীতি। তাই প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো: আপেল মামুন তার দায়িত্ব পালনে দুর্নীতির নজির সৃষ্টি করেছেন। তিনি সবাইকে বোকা ভেবে নিজেকে খুব চালাক মনে করেন বিধায় তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

তারা আরও জানান, দুর্নীতি শুধু সরকারি কর্মকর্তার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে যারা ঠিকাদার তারা যেন-তেন কাজ করে প্রকল্প পরিচালককে ম্যানেজ করে সংবদ্ধ হয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেন। বিপিসির এই ভবন নির্মাণে ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। কেবল অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরও অর্থ-সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে। তাই বিপিসির ৬০ কোটি টাকা ভবন নির্মাণে হরিলুট হয়েছে এটাই স্বাভাবিক।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, উপ ব্যপস্থাপক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী মো: আপেল মামুন ভনটির তদারকির দায়িত্ব ছিলেন, তিনি সর্বদা ঠিকাদারের সঙ্গে ছিলেন, পজিটিভ রিপোর্ট দিতে তিনি মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করেছেন, ঠিকাদাররাও তাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে সব কিছু ম্যানেজ করে ভবনটি নির্মাণ করেছেন। এখানে তিনি প্রতিটি ধাপের কাজে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এবং তার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন স্যাররাও লাভবান হয়েছেন। এখানে আপেল মামুনেই নাটেরগুরু। তাঁকে ধরলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর সল্টগোলা এলাকার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবন থেকে সার্সন রোডের ভাড়া ভবনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপিসির নিজস্ব সদর দপ্তর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভবনটি উদ্বোধনও হয়ে গেছে। কিন্তু উদ্বোধনের পর প্রথম বর্ষাতেই বেরিয়ে এসেছে নির্মাণকাজের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ও অসংগতি।

দেখা গেছে, অফিস শুরুর প্রথম দিনেই বৃষ্টির পানি ঢুকেছে বিভিন্ন কক্ষে। পানি ঠেকাতে পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশ ঢেকে দিতে হয়েছে ত্রিপল দিয়ে। এবার নতুন করে ভবনের উত্তর পাশের অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি ভবনের এমন চিত্রে শুধু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না, প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও।

জয়পাহাড় এলাকায় নির্মিত বিপিসির নিজস্ব ভবনে অফিস স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুলাই সেখানে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এরপর ১২ জুলাই থেকে নতুন ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভবনে অফিস শুরুর প্রথম দিনেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে আসে অফিসের বিব্রতকর চিত্র। বৃষ্টির পানি থেকে ভবনকে রক্ষা করতে পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশ ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

অর্থাৎ—দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে থাকার পর বিপিসি যে নিজস্ব ভবন পেল, তার প্রথম বর্ষার পরীক্ষাই হলো ত্রিপলের নিচে। নতুন সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মো. আপেল মামুন ভবনে পানি ঢোকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, নির্মাণকাজের মান খারাপ হয়নি। তিনি বলেন, ভবনের কাচে এক ধরনের আঠা না দেওয়ায় পানি ঢুকেছে। এদিকে পানি ঢোকার ঘটনা সামলানোর আগেই এবার সামনে এসেছে ভবনের দেয়ালে ফাটলের বিষয়টি।

সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের উত্তর পাশের অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেও ভবনের দেয়ালের কয়েকটি অংশে ফাটল দেখা দিয়েছিল যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পরে চালাকি করে দ্রুত পুডিং ও প্লাস্টার করে সেগুলো মেরামত করা হয়। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. আপেল মামুন অবশ্য বিষয়টিকে বড় কোনো ত্রুটি হিসেবে দেখছেন না বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, পাঁচতলা ভবনটি ইস্পাত কাঠামোয় নির্মিত হচ্ছে। ইস্পাত কাঠামোর সঙ্গে সিমেন্টের বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম ফাটল হচ্ছে। ফলে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা যাচ্ছে। তবে এতে ভবনের কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, এগুলো বড় ধরনের ফাটল নয়। নির্মাণকাজের সময় ছোটখাটো ফাটল দেখা দিতেই পারে। পুডিং ও প্লাস্টার করে সেগুলো মেরামত করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মো. আমিন ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার দাবি, ইস্পাত কাঠামোর কারণে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা যাচ্ছে। এগুলো পুডিং দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। দেয়ালের কয়েকটি অংশের এসব ফাটলে মূল ভবনের কোনো ক্ষতি হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

বিপিসি ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর নিজস্ব সদর দপ্তর পেল বিপিসি।

জয়পাহাড় এলাকায় গত বছর পাঁচতলা ইস্পাত কাঠামোর ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। নতুন ভবনে প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করবেন। কিন্তু সেই বহুল প্রতীক্ষিত নিজস্ব ভবনেই উদ্বোধনের পর প্রথম বর্ষায় পানি, এরপর দেয়ালে ফাটল- সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিপিসির পুরো প্রকল্পটি।

জানা গেছে, বিপিসি বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে এসব তেল বাজারজাত করা হয়। বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা হয়। এমন একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর নির্মাণে সামান্যতম গাফিলতিও গ্রহণযোগ্য নয় বলছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা।

অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো: আপেল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পিরোজপুরে এলজিইডিতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কাগজে কাজ দেখিয়ে ১১০০ কোটি লোপাট

প্রকল্প পরিচালকের আড়ালে দুর্নীতি চক্রের হোতা, হাতিয়েছেন কোটি টাকা

আপডেট সময় ০২:০৯:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

দেশের সরকারি-বেসরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বহুমাত্রিক দুর্নীতি শুধু ব্যাধিই নয়, সরকারি কাঠামোয় ক্ষয় ধরিয়েছে। দুর্নীতির ক্ষত উপশমের লক্ষ্যে প্রতিটি সরকারের তরফেই দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের পাশাপাশি দৃশ্যমান পদক্ষেপ সত্ত্বেও দুর্নীতির অপছায়া সরানো যে কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে কৌশলে এরই কদর্য নজির স্থাপন করেছে চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তর নির্মাণ ঘিরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোভ ও অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি হয়। ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের বিধিবিধান ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেয়া হলো দুর্নীতি। তাই প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো: আপেল মামুন তার দায়িত্ব পালনে দুর্নীতির নজির সৃষ্টি করেছেন। তিনি সবাইকে বোকা ভেবে নিজেকে খুব চালাক মনে করেন বিধায় তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।

তারা আরও জানান, দুর্নীতি শুধু সরকারি কর্মকর্তার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে যারা ঠিকাদার তারা যেন-তেন কাজ করে প্রকল্প পরিচালককে ম্যানেজ করে সংবদ্ধ হয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেন। বিপিসির এই ভবন নির্মাণে ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। কেবল অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরও অর্থ-সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে। তাই বিপিসির ৬০ কোটি টাকা ভবন নির্মাণে হরিলুট হয়েছে এটাই স্বাভাবিক।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, উপ ব্যপস্থাপক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী মো: আপেল মামুন ভনটির তদারকির দায়িত্ব ছিলেন, তিনি সর্বদা ঠিকাদারের সঙ্গে ছিলেন, পজিটিভ রিপোর্ট দিতে তিনি মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করেছেন, ঠিকাদাররাও তাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে সব কিছু ম্যানেজ করে ভবনটি নির্মাণ করেছেন। এখানে তিনি প্রতিটি ধাপের কাজে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এবং তার মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন স্যাররাও লাভবান হয়েছেন। এখানে আপেল মামুনেই নাটেরগুরু। তাঁকে ধরলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর সল্টগোলা এলাকার বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবন থেকে সার্সন রোডের ভাড়া ভবনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপিসির নিজস্ব সদর দপ্তর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভবনটি উদ্বোধনও হয়ে গেছে। কিন্তু উদ্বোধনের পর প্রথম বর্ষাতেই বেরিয়ে এসেছে নির্মাণকাজের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ও অসংগতি।

দেখা গেছে, অফিস শুরুর প্রথম দিনেই বৃষ্টির পানি ঢুকেছে বিভিন্ন কক্ষে। পানি ঠেকাতে পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশ ঢেকে দিতে হয়েছে ত্রিপল দিয়ে। এবার নতুন করে ভবনের উত্তর পাশের অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সরকারি ভবনের এমন চিত্রে শুধু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের দায় নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না, প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও।

জয়পাহাড় এলাকায় নির্মিত বিপিসির নিজস্ব ভবনে অফিস স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুলাই সেখানে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এরপর ১২ জুলাই থেকে নতুন ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ভবনে অফিস শুরুর প্রথম দিনেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে আসে অফিসের বিব্রতকর চিত্র। বৃষ্টির পানি থেকে ভবনকে রক্ষা করতে পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশ ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।

অর্থাৎ—দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে থাকার পর বিপিসি যে নিজস্ব ভবন পেল, তার প্রথম বর্ষার পরীক্ষাই হলো ত্রিপলের নিচে। নতুন সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মো. আপেল মামুন ভবনে পানি ঢোকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, নির্মাণকাজের মান খারাপ হয়নি। তিনি বলেন, ভবনের কাচে এক ধরনের আঠা না দেওয়ায় পানি ঢুকেছে। এদিকে পানি ঢোকার ঘটনা সামলানোর আগেই এবার সামনে এসেছে ভবনের দেয়ালে ফাটলের বিষয়টি।

সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের উত্তর পাশের অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল রয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেও ভবনের দেয়ালের কয়েকটি অংশে ফাটল দেখা দিয়েছিল যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পরে চালাকি করে দ্রুত পুডিং ও প্লাস্টার করে সেগুলো মেরামত করা হয়। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. আপেল মামুন অবশ্য বিষয়টিকে বড় কোনো ত্রুটি হিসেবে দেখছেন না বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, পাঁচতলা ভবনটি ইস্পাত কাঠামোয় নির্মিত হচ্ছে। ইস্পাত কাঠামোর সঙ্গে সিমেন্টের বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম ফাটল হচ্ছে। ফলে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা যাচ্ছে। তবে এতে ভবনের কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, এগুলো বড় ধরনের ফাটল নয়। নির্মাণকাজের সময় ছোটখাটো ফাটল দেখা দিতেই পারে। পুডিং ও প্লাস্টার করে সেগুলো মেরামত করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মো. আমিন ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার দাবি, ইস্পাত কাঠামোর কারণে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা যাচ্ছে। এগুলো পুডিং দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে। দেয়ালের কয়েকটি অংশের এসব ফাটলে মূল ভবনের কোনো ক্ষতি হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

বিপিসি ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর নিজস্ব সদর দপ্তর পেল বিপিসি।

জয়পাহাড় এলাকায় গত বছর পাঁচতলা ইস্পাত কাঠামোর ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। নতুন ভবনে প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করবেন। কিন্তু সেই বহুল প্রতীক্ষিত নিজস্ব ভবনেই উদ্বোধনের পর প্রথম বর্ষায় পানি, এরপর দেয়ালে ফাটল- সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিপিসির পুরো প্রকল্পটি।

জানা গেছে, বিপিসি বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মাধ্যমে এসব তেল বাজারজাত করা হয়। বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা হয়। এমন একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর নির্মাণে সামান্যতম গাফিলতিও গ্রহণযোগ্য নয় বলছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা।

অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো: আপেল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।