ঢাকা ০৩:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জাপানি প্রধানমন্ত্রীর উপহারের মন্তব্যে বিপাকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে সুইডেনের সহায়তা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পঞ্চগড়ে এসজিপিটি পরীক্ষায় সরকারী হাসপাতাল-প্রাইভেট ডায়াগনেস্টিক রিপোর্টে ব্যাপক গড়মিল রাষ্ট্রপতি পদে এখনও ঠিক হয়নি বিএনপি প্রার্থী: চিফ হুইপ ‘সব জায়গায় বসে থাকবে আর খালি আগুন দিবে’, কাদেরকে শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করার চেষ্টা করছে স্বাধীনতাবিরোধীরা: রিজভী ইউক্রেনজুড়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৯ আত্রাইয়ে ১৩ প্রাণের শোকে স্তব্ধ পরিবারগুলো এখনো কান্না থামছে না স্বজনদের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের আগে কৃষিজমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

আত্রাইয়ে ১৩ প্রাণের শোকে স্তব্ধ পরিবারগুলো এখনো কান্না থামছে না স্বজনদের

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১৩ জন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা। রোববার বিকেলে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনার সংবাদ যখন আত্রাইয়ে পৌঁছায়, তখন মধ্যরাত। সেই থেকে এই পরিবারগুলোতে চলছে কান্নার রোল। পরিবারের সুখের জন্য কত কষ্ট সয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে ছিলেন এই মানুষগুলো, অথচ মৃত্যুর সময় পাশে পেলেন না কাউকে, এ কথা মনে করে আজও কান্না থামছে না স্বজনদের।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের চারজন রয়েছেন। তাঁরা হলেন মহন প্রামাণিক (২২) ও তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬) এবং রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
 উপজেলার আরও অন্য নিহত ব্যক্তিরা হলেন সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০)।
উপজেলার গন্ডগোহালি, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গতকাল মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আপন দুই ছেলে মহন ও সুমনকে হারিয়ে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে আর মেজ ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনো দিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, শেষ করে বাড়ি আসব। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’
নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকল না বাবা। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা সাহাগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’ ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। তিনি বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকেন এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।
হাসিবুল সম্পর্কে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করতো। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন যাপন করে। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে তিনি সৌদি আরবে যান।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, এখন তাঁদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে।
যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানি প্রধানমন্ত্রীর উপহারের মন্তব্যে বিপাকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী

আত্রাইয়ে ১৩ প্রাণের শোকে স্তব্ধ পরিবারগুলো এখনো কান্না থামছে না স্বজনদের

আপডেট সময় ০১:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে ১৩ জন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা। রোববার বিকেলে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনার সংবাদ যখন আত্রাইয়ে পৌঁছায়, তখন মধ্যরাত। সেই থেকে এই পরিবারগুলোতে চলছে কান্নার রোল। পরিবারের সুখের জন্য কত কষ্ট সয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে ছিলেন এই মানুষগুলো, অথচ মৃত্যুর সময় পাশে পেলেন না কাউকে, এ কথা মনে করে আজও কান্না থামছে না স্বজনদের।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের চারজন রয়েছেন। তাঁরা হলেন মহন প্রামাণিক (২২) ও তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬) এবং রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
 উপজেলার আরও অন্য নিহত ব্যক্তিরা হলেন সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০)।
উপজেলার গন্ডগোহালি, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গতকাল মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। আপন দুই ছেলে মহন ও সুমনকে হারিয়ে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে আর মেজ ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনো দিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, শেষ করে বাড়ি আসব। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’
নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকল না বাবা। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা সাহাগোলা ইউনিয়নের উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’ ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে।
ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। তিনি বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকেন এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।
হাসিবুল সম্পর্কে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করতো। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন যাপন করে। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে তিনি সৌদি আরবে যান।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, এখন তাঁদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে।
যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।