ঢাকা ০৩:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজউক জোন-৪ পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়াকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতি মেট্রোরেলের টেন্ডারে ই-জিপি নেই, উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ শ্রীপুর সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিল কুমিল্লা বোর্ডে এসএসসিতে পাসের হার ৬৫.৪২ শতাংশ, এগিয়ে মেয়েরা বিআরটিসির জোয়ার সাহারা ডিপোর ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ‘কর্তনের’ অভিযোগ এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ নাড়াইছড়ি রেঞ্জে দুই বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পিআইও এনামুল হকের দীর্ঘ ‘রাজত্ব’ দুদকের জালে শ্রীনগর উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা জুয়েল শিকদার ১৫ বছর আউটসোর্সিং টেন্ডারে দেলোয়ারের আধিপত্য
একবার ঢুকলে বের করা যায় না

১৫ বছর আউটসোর্সিং টেন্ডারে দেলোয়ারের আধিপত্য

আওয়ামী লীগের ৪ মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় ১৫ বছর একচ্ছত্র আধিপত্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও বহাল তবিয়তে পিমা অ্যাসোসিয়েটসের মালিক একবার ঢুকলে ‘ম্যানেজ’ করেই থেকে যান দেলোয়ার।
আউটসোর্সিং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের কাল্পনিক চিত্রায়ণ। এই ছবিতে দেখানো চরিত্র ও ঘটনাগুলি প্রতীকী এবং বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো মিল নেই।

আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়কে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের বিরুদ্ধে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দুই মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্রভাবে ঠিকাদারিতে রাজত্ব করেছেন তিনি।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও দেলোয়ারের ভেলকিতে কাজ পায়নি অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনে গোপন চুক্তির ভিত্তিতে ওই টেন্ডার বাতিল করে দেলোয়ার কাজ ছিনিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মন্ত্রীদের ছত্রছায়া এবং নিজের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা তিনি নিজেই গর্বের সঙ্গে ফলাও করে সর্বত্র প্রচার করে বেড়ান। ঠিকাদারি জগতের ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত দেলোয়ারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও রয়েছে।

জানা গেছে, মো. দেলোয়ার হোসেন দুলাল পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পাশাপাশি বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার সাপ্লায়ার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং একজন আউটসোর্সিং ও জনবল সরবরাহ ব্যবসায়ী। তিনি সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহ ও নিয়োগ-সংক্রান্ত ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করে থাকেন।

বর্তমানে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন। পাশাপাশি অতীতে বরিশাল জেলার একজন পদধারী ছাত্রনেতা হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলেও পটুয়াখালী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া, জামালপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এবং জামালপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলারের ছত্রছায়ায় প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক টেন্ডার বাগিয়ে নেন এই ‘ম্যানেজ মাস্টার’।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বস্ত্র অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যানবাহন চালনা প্রশিক্ষণ প্রকল্প, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী উন্নয়ন প্রচার কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৫ম, ৪র্থ ও ৩য় পর্যায়), ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরোহিত-সেবাইতদের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি, দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল (বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ প্রকল্প, বাংলাদেশ কৃষি প্রকল্প (ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল), সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়), মাতুয়াইল মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পঞ্চগড় জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়, বোদা ও তেতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিএডিসির সিলেট বিভাগের ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের কাজ পেয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দেলোয়ার হোসেন দুলালের প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি।

অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ২০০১ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাজের মাধ্যমে ঠিকাদারি শুরু করলেও মূলত ২০১১ সালে দেলোয়ারের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। ২০০৮ সালে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিন বছর পর ওই প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হন পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলাল। ওই বছর তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় তিনি হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ঠিকাদারি কাজ পান। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে তার প্রভাবের কারণে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই কাজ পায়নি। সব কাজই তিনি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এছাড়া দক্ষিণ অঞ্চল (বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ প্রকল্পের কাজও তৎকালীন ওই ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ২০১৪ সালে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের ঘনিষ্ঠ হয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের জনবল সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেন দেলোয়ার। অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকে সেখানে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের সুযোগ পায়নি।

এদিকে ২০২০ সালে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান ধর্মমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব ব্যবহার করে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টসহ তৎকালীন বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেয় পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনবল সরবরাহের কাজেও পিমা অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও প্রয়োজন হলে সেই দরপত্র বাতিল করার নজিরও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জনবল সরবরাহের জন্য ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে সাতক্ষীরার একটি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের মোট আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ওই দরপত্রে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড সর্বোচ্চ দরদাতা এবং সলিউশন ফোর্স লিমিটেড-একুশে সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দরপত্রটি বাতিল করে। পরে নতুন শর্ত সংযুক্ত করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত।

এ বিষয়ে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলাল বলেন, ‘আমার কোম্পানি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। আমি একবার যেখানে কাজ শুরু করি, সেখান থেকে আর বের হতে হয় না। আল্লাহর রহমতে আমি সেখানেই থেকে যাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১১ সালে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টে কাজ শুরু করেছি। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত কাজ করেছি। আবার প্রকল্প চালু হলে এই দুলালকেই নিতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট হোক বা অন্য যেখানেই হোক, এই দুলাল একবার ঢুকে পড়লে তাকে আর বের করা যায় না।’

ফোনালাপে তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান মন্দিরভিত্তিক শিক্ষার টেন্ডার দিয়েছিলেন। পরে একটি গ্রুপ সেই কাজটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মন্ত্রী সাহেব বলে দিয়েছেন, ‘না, এটা দেলোয়ার সাহেবই করবেন।’ স্যারকেও (ফরিদুল হক খান) আমি খুশি করেছি। স্যার যেখানে লোক দিতে বলেছেন, সেখানেই আমি লোক দিয়েছি।’

এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক আমাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে কাজ দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত আমি সেখানেই টিকে আছি।’

পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের সঙ্গে হওয়া এসব ফোনালাপের অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো আউটসোর্সিং টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হয়। এর ফলে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়।

তাদের মতে, পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজউক জোন-৪ পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়াকে ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতি

একবার ঢুকলে বের করা যায় না

১৫ বছর আউটসোর্সিং টেন্ডারে দেলোয়ারের আধিপত্য

আপডেট সময় ০১:০৬:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

আওয়ামী লীগের ৪ মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় ১৫ বছর একচ্ছত্র আধিপত্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও বহাল তবিয়তে পিমা অ্যাসোসিয়েটসের মালিক একবার ঢুকলে ‘ম্যানেজ’ করেই থেকে যান দেলোয়ার।
আউটসোর্সিং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের কাল্পনিক চিত্রায়ণ। এই ছবিতে দেখানো চরিত্র ও ঘটনাগুলি প্রতীকী এবং বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো মিল নেই।

আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়কে কেন্দ্র করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের বিরুদ্ধে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দুই মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে একচ্ছত্রভাবে ঠিকাদারিতে রাজত্ব করেছেন তিনি।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও দেলোয়ারের ভেলকিতে কাজ পায়নি অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনে গোপন চুক্তির ভিত্তিতে ওই টেন্ডার বাতিল করে দেলোয়ার কাজ ছিনিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মন্ত্রীদের ছত্রছায়া এবং নিজের একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা তিনি নিজেই গর্বের সঙ্গে ফলাও করে সর্বত্র প্রচার করে বেড়ান। ঠিকাদারি জগতের ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত দেলোয়ারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও রয়েছে।

জানা গেছে, মো. দেলোয়ার হোসেন দুলাল পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পাশাপাশি বাংলাদেশ আউটসোর্সিং ম্যানপাওয়ার সাপ্লায়ার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং একজন আউটসোর্সিং ও জনবল সরবরাহ ব্যবসায়ী। তিনি সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহ ও নিয়োগ-সংক্রান্ত ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করে থাকেন।

বর্তমানে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন। পাশাপাশি অতীতে বরিশাল জেলার একজন পদধারী ছাত্রনেতা হিসেবেও নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলেও পটুয়াখালী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া, জামালপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক এবং জামালপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান দুলারের ছত্রছায়ায় প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক টেন্ডার বাগিয়ে নেন এই ‘ম্যানেজ মাস্টার’।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বস্ত্র অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যানবাহন চালনা প্রশিক্ষণ প্রকল্প, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী উন্নয়ন প্রচার কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৫ম, ৪র্থ ও ৩য় পর্যায়), ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরোহিত-সেবাইতদের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি, দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল (বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ প্রকল্প, বাংলাদেশ কৃষি প্রকল্প (ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল), সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়), মাতুয়াইল মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পঞ্চগড় জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়, বোদা ও তেতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিএডিসির সিলেট বিভাগের ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল সরবরাহের কাজ পেয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দেলোয়ার হোসেন দুলালের প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি।

অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ২০০১ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কাজের মাধ্যমে ঠিকাদারি শুরু করলেও মূলত ২০১১ সালে দেলোয়ারের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। ২০০৮ সালে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়া ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিন বছর পর ওই প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হন পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলাল। ওই বছর তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় তিনি হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ঠিকাদারি কাজ পান। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে তার প্রভাবের কারণে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই কাজ পায়নি। সব কাজই তিনি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এছাড়া দক্ষিণ অঞ্চল (বরিশাল ও পটুয়াখালী) বীজ প্রকল্পের কাজও তৎকালীন ওই ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর ২০১৪ সালে সাতক্ষীরা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের ঘনিষ্ঠ হয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের জনবল সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেন দেলোয়ার। অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকে সেখানে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের সুযোগ পায়নি।

এদিকে ২০২০ সালে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান ধর্মমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব ব্যবহার করে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টসহ তৎকালীন বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেয় পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ল্যান্ড পোর্ট অথরিটি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনবল সরবরাহের কাজেও পিমা অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও প্রয়োজন হলে সেই দরপত্র বাতিল করার নজিরও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জনবল সরবরাহের জন্য ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে সাতক্ষীরার একটি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের মোট আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ওই দরপত্রে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড সর্বোচ্চ দরদাতা এবং সলিউশন ফোর্স লিমিটেড-একুশে সিকিউরিটি সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দরপত্রটি বাতিল করে। পরে নতুন শর্ত সংযুক্ত করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত।

এ বিষয়ে পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলাল বলেন, ‘আমার কোম্পানি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। আমি একবার যেখানে কাজ শুরু করি, সেখান থেকে আর বের হতে হয় না। আল্লাহর রহমতে আমি সেখানেই থেকে যাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১১ সালে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টে কাজ শুরু করেছি। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত কাজ করেছি। আবার প্রকল্প চালু হলে এই দুলালকেই নিতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট হোক বা অন্য যেখানেই হোক, এই দুলাল একবার ঢুকে পড়লে তাকে আর বের করা যায় না।’

ফোনালাপে তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ধর্মমন্ত্রী ফরিদুল হক খান মন্দিরভিত্তিক শিক্ষার টেন্ডার দিয়েছিলেন। পরে একটি গ্রুপ সেই কাজটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মন্ত্রী সাহেব বলে দিয়েছেন, ‘না, এটা দেলোয়ার সাহেবই করবেন।’ স্যারকেও (ফরিদুল হক খান) আমি খুশি করেছি। স্যার যেখানে লোক দিতে বলেছেন, সেখানেই আমি লোক দিয়েছি।’

এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক আমাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে কাজ দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত আমি সেখানেই টিকে আছি।’

পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের সঙ্গে হওয়া এসব ফোনালাপের অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো আউটসোর্সিং টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ব্যাহত হয়। এর ফলে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হয়।

তাদের মতে, পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।