ঢাকা ০৫:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টুঙ্গিপাড়ায় জলাবদ্ধতায় এক গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা বৃষ্টিতে গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম, উঠান, গ্রামীণ সড়ক এমনকি কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে এলাকাবাসীর। রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন পার করছে। পাশাপাশি সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের আতঙ্কে রাত কাটছে নির্ঘুম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার আবেদন, লিখিত অভিযোগ ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও বাস্তবে মিলেনি কোনো সুফল।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মানুষ মারা যাওয়ার পর অন্তত শান্তিতে থাকার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে একটু বৃষ্টি হলেই কবরস্থান পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম সবকিছু তলিয়ে যায়। সরকার আসে, সরকার যায়; চেয়ারম্যান-মেম্বার আসে, প্রতিশ্রুতিও দেয়, কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত পাটগাতী মধ্যপাড়া গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। গ্রামটিতে কবরস্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণশিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা পানির নিচে চলে যায়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
গ্রামের বাসিন্দা সামসুরনাহার বলেন, “আমি অসুস্থ মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে ঘরের ভেতরে পানি উঠে গেছে। এই অবস্থায় রান্না করা, খাওয়া কিংবা বাথরুম ব্যবহার—কোনোটাই স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।”
একই গ্রামের রফিক শেখ, ইসুব শেখ, নেয়ামত শেখ, শহীদ ফকির, মসিউর শেখ, ফরিদ মোল্লা, শামসুল হক শেখ ও লক্ষণ সাহাসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনও কাঠ বা জ্বালানি দিয়ে চুলায় রান্না করেন। অনেকের গ্যাস কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু রান্নাঘর পানিতে ডুবে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কেউ একবেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আবার অনেককে বাধ্য হয়ে হোটেলে গিয়ে খাবার খেতে হচ্ছে।
তারা আরও জানান, বাথরুম পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় সেপটিক ট্যাংকের ময়লা বের হয়ে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। অন্যদিকে, রাতে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয় পানি নিষ্কাশনের নির্দেশ দিয়েছেন। খুব দ্রুত পানি অপসারণের কাজ শুরু করা হবে।”
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল আলম বলেন, “টুঙ্গিপাড়া নিচু এলাকা হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে এবং সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানার পর জরুরি ভিত্তিতে পানি অপসারণের জন্য প্যানেল চেয়ারম্যান ও পৌরসভার প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনদুর্ভোগের বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
এদিকে, দীর্ঘদিনের এ জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন এবং স্থায়ী পানি নিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

টুঙ্গিপাড়ায় জলাবদ্ধতায় এক গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী

আপডেট সময় ০৩:৩২:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা বৃষ্টিতে গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম, উঠান, গ্রামীণ সড়ক এমনকি কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে এলাকাবাসীর। রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন পার করছে। পাশাপাশি সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের আতঙ্কে রাত কাটছে নির্ঘুম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যায় ভুগলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার আবেদন, লিখিত অভিযোগ ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও বাস্তবে মিলেনি কোনো সুফল।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মানুষ মারা যাওয়ার পর অন্তত শান্তিতে থাকার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে একটু বৃষ্টি হলেই কবরস্থান পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম সবকিছু তলিয়ে যায়। সরকার আসে, সরকার যায়; চেয়ারম্যান-মেম্বার আসে, প্রতিশ্রুতিও দেয়, কিন্তু কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত পাটগাতী মধ্যপাড়া গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। গ্রামটিতে কবরস্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণশিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা পানির নিচে চলে যায়। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
গ্রামের বাসিন্দা সামসুরনাহার বলেন, “আমি অসুস্থ মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে ঘরের ভেতরে পানি উঠে গেছে। এই অবস্থায় রান্না করা, খাওয়া কিংবা বাথরুম ব্যবহার—কোনোটাই স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।”
একই গ্রামের রফিক শেখ, ইসুব শেখ, নেয়ামত শেখ, শহীদ ফকির, মসিউর শেখ, ফরিদ মোল্লা, শামসুল হক শেখ ও লক্ষণ সাহাসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনও কাঠ বা জ্বালানি দিয়ে চুলায় রান্না করেন। অনেকের গ্যাস কেনার সামর্থ্য নেই। কিন্তু রান্নাঘর পানিতে ডুবে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কেউ একবেলা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আবার অনেককে বাধ্য হয়ে হোটেলে গিয়ে খাবার খেতে হচ্ছে।
তারা আরও জানান, বাথরুম পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় সেপটিক ট্যাংকের ময়লা বের হয়ে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। অন্যদিকে, রাতে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয় পানি নিষ্কাশনের নির্দেশ দিয়েছেন। খুব দ্রুত পানি অপসারণের কাজ শুরু করা হবে।”
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল আলম বলেন, “টুঙ্গিপাড়া নিচু এলাকা হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে এবং সাংবাদিকদের কাছ থেকে জানার পর জরুরি ভিত্তিতে পানি অপসারণের জন্য প্যানেল চেয়ারম্যান ও পৌরসভার প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনদুর্ভোগের বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
এদিকে, দীর্ঘদিনের এ জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন এবং স্থায়ী পানি নিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে।