স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এ আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত একজন ড্রাইভারকে ঘিরে উঠেছে নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি শুধু গাড়ি চালকের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নন; বরং বদলি, পদায়ন ও বিভিন্ন নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এলজিইডিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া একজন ড্রাইভারের মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে যেখানে স্বল্প আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন, সেখানে রফিকুল ইসলামের জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তার রাজধানী ও গাজীপুরে একাধিক বাড়ি রয়েছে এবং রয়েছে ব্যক্তিগত দুটি গাড়ি। অভিযোগ করা হয়েছে, এসব গাড়ি তিনি তার কর্মস্থল এলজিইডিতেই ভাড়া দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলীর গাড়িচালক রফিকুল ইসলামের অবৈধ আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বদলি তদবির, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার। উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলির ক্ষেত্রে তার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বেলাল হোসেন যখন দুই দফায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) ছিলেন, তখন থেকেই রফিকুল ইসলাম নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় হন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেলাল হোসেন প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলজিইডির এক ড্রাইভার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্ট্যান্ডবাই গাড়ি চালকদের ডিউটি বণ্টনও রফিকুল ইসলামের নির্দেশে হয়ে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে আর্থিক সুবিধা দিলে ভালো ডিউটি পাওয়া যায়, আর না দিলে ডিউটি রোস্টারে নাম ওঠে না।
অভিযোগ রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া এই ড্রাইভার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের বদলি করাতে ভূমিকা রাখেন। সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার উপজেলা প্রকৌশলীর পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে রফিকুল ইসলাম ভূমিকা রাখেন এবং এ বাবদ ৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এলজিআরডি মন্ত্রী ওই আদেশ বাতিলের কথা বললেও প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন তা বাতিল করেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্প্রতি এলজিইডিতে বিভিন্ন জেলায় প্রায় অর্ধশত নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব পদায়নকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের ডিও লেটার সামনে রেখে পদায়ন করা হলেও এর পেছনে আর্থিক লেনদেন চলে। সাম্প্রতিক নিয়োগ ও পদায়নে জেলা অনুযায়ী ২৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অর্থের বড় অংশ ড্রাইভার রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া আউটসোর্সিং নিয়োগ, উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলির ক্ষেত্রে রফিকুল ইসলামের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলির আদেশ হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, জন্মদিনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে উপহার দেওয়ার নামে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক ও উপজেলা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করেন রফিকুল ইসলাম। এ কারণে সংস্থার ভেতরে তিনি আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
রফিকুল ইসলামের সম্পদ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর হলেও বর্তমানে তিনি গাজীপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ আয়ের অর্থে তিনি গাজীপুরে তিনটি বাড়ি করেছেন। এর মধ্যে একটি বাড়ি প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বলে দাবি করা হয়েছে। গাজীপুর সাফারি পার্কের কাছেও তার একটি ছয়তলা বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে তার পরিবার বসবাস করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রফিকুল ইসলামের দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে, যা এলজিইডির অফিসে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসব গাড়ি থেকে মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় হয় বলে দাবি করা হয়েছে। সূত্রের ভাষ্য, সপ্তাহজুড়ে ঘুষ বাবদ যে অর্থ আসে, তা বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় তার আরেকটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে, যেখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভাড়া আসে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধেও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, অনিয়ম এবং সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডিতে দায়িত্ব পালনকালে মো. বেলাল হোসেন নিজের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন। তার বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্দেশে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৪০টি উন্নয়নমূলক কাজ সম্পূর্ণ না করেই শতভাগ ভুয়া বিল উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এসব অভিযোগের সঙ্গেও তার নাম জড়ানো হয়েছে।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) এবং পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি এলজিইডির বিভিন্ন লাভজনক এলাকায় প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন কেনাকাটা, সরঞ্জাম সরবরাহ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেওয়ার সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতি বা মামলায় অভিযুক্ত এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তিনি পরিশ্রম করে উপার্জন করেন এবং অবৈধ আয় ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ শিরোনাম ::
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ও ড্রাইভার রফিকের অনিয়ম দূর্নীতি
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৪:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
- ৫১৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















