শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো জোনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাবেক নেতা মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ। তার বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা এবং একটি তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ থাকলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩০ মার্চ ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে আলিফকে সাভার ও ঢাকা জেলা জোন থেকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনে বদলি করা হয়। এরপর থেকেই তার এ পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
অধিদপ্তর-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমানে আগারগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নতুন প্রধান কার্যালয় নির্মাণের প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই তাকে ঢাকা মেট্রো জোনে আনা হয়েছে। এ পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ কোটি টাকার অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।
দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখার আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। পরে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট গঠিত কমিটিতে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সংগঠনের অনেক নেতাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হলেও আলিফ এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এ নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে
২০২২ সালে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজে বরাদ্দবিহীন বিল পরিশোধসহ নানা অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভিতবিশিষ্ট ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণকাজের জন্য ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির দরপত্র মূল্য ছিল ৪ কোটি ৪৩ হাজার ১০৫ টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মোজাহিদুল ইসলাম আলিফের সংশ্লিষ্টতায় ষষ্ঠ তলার আরসিসি কাজ, ইটের গাঁথুনি, আস্তর, দরজা-জানালা, গ্রিলসহ বিভিন্ন কাজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায়, ভবনটির তখনও চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল এবং দ্বিতীয় তলার ইটের গাঁথুনির কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অর্থাৎ প্রায় এক বছর পরও প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ অসম্পন্ন ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে আলিফের ভূমিকা ছিল।
সাভারে দায়িত্ব পালনকালেও অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাভার জোনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ভবন প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পদ্মা কনস্ট্রাকশনকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়। এ ঘটনাও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।
দুদকে অভিযোগ
শিক্ষা প্রকৌশলীদের বিভিন্ন ফোরাম এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা অভিযোগে আলিফের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, অস্বচ্ছ পদায়ন ও দরপত্র-সংক্রান্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে গত এপ্রিল ও মে মাসে ঢাকা মেট্রো জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে তিনি একাধিক মাসিক সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন। একই সময়ে সরকারি অর্জিত ছুটি নিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরের অনুমতিও পান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, অতীতে তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও আলিফের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, যা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ বলেন, “আমার কোনো মন্তব্য নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















