সরকারি প্রকল্পের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন, যার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তথ্য জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তথ্য নিতে চাইলে স্থানীয় এমপির অনুমতি লাগবে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন তিন বছর ধরে নরসিংদী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। বিগত সরকারের আমলে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে চললেও, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বাহ্যিক আচরণে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে তার দুর্নীতি থামেনি। বিভিন্ন সরকারি বড় প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নরসিংদীর স্থানীয় সাংবাদিকরা তথ্য অধিকার আইনে নির্ধারিত ফরমে এবং লিখিত আবেদনের মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থবছরের মাঠপর্যায়ের কাজের অগ্রগতি ও তথ্য জানতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি অধিকাংশ সাংবাদিকদের ফোন কলও তিনি রিসিভ করেন না। সশরীরে অফিসে গিয়ে তথ্য চাইলে তিনি জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোনো তথ্য জানতে হলে স্থানীয় এমপির অনুমতি লাগবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ প্রকৌশলীর বাড়ি পাবনা জেলায়। বিগত সরকারের আমল থেকেই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি নরসিংদীতে স্বেচ্ছাচারীভাবে দপ্তর চালিয়ে আসছেন। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ না করিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনস্বার্থে সাধারণ দরিদ্র পরিবারে নলকূপ এবং গভীর নলকূপ সরকারের নির্ধারিত ফির মাধ্যমে স্থাপন করা হয়ে থাকে। সে কাজগুলো করে থাকে প্রতিটি উপজেলাভিত্তিক জনস্বাস্থ্য অফিস এবং এর মূল নিয়ন্ত্রণ করেন নরসিংদী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। প্রকৌশলীর সেই নির্বাহী ক্ষমতাবলে টানা প্রায় তিন বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনেকের বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কথা বলে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়েও বেশি টাকা নেওয়ার পরও নলকূপ স্থাপনের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করেননি। এক বাড়িতে প্রায় দেড় বছর আগে নলকূপের শুধু পাইপ স্থাপন করেছে জনস্বাস্থ্যের ঠিকাদারের লোকজন। কিন্তু অবশিষ্ট কাজ আজ পর্যন্ত করেনি। এ রকম শত শত অনিয়মের মধ্যে চলছে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এমনও অভিযোগ উঠছে, বিভিন্ন নামে-বেনামে মাঠপর্যায়ে নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি দপ্তরের নলকূপ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ফ্যামিলিতে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পৌর শহরের অনেক বিত্তশালীদের বাসাবাড়িতেও দেওয়া হয়েছে। আবার দেখা গেছে, অনেক জনপ্রতিনিধির সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন জনকে নলকূপ বরাদ্দের হিসাব কাগজপত্রে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রায়পুরার ডৌকারচর ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক রুমান মিয়া জানান, প্রায় দেড় বছর আগে তাদের বাড়িতে একটি নলকূপের শুধু পাইপ স্থাপন করে চলে গেছে। অবশিষ্ট কাজ এখন পর্যন্ত করেনি। অফিসে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ‘আপনার নামে তালিকা খুঁজে পাচ্ছি না’।
নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মোবারক হোসেন বলেন, প্রায় ৯ মাস আগে নির্ধারিত তথ্য অধিকার ফর্মে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। পরে তথ্য নেওয়ার জন্য প্রকৌশলীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করলেও তিনি নানা টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রকৌশলী জানান, কোনো তথ্য নিতে হলে ঠিকাদারদের অনুমতি লাগবে। ঠিকাদারদের অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না দেওয়ায় ফের আপিল আবেদন করি। তারপরও কোনো তথ্য দেননি। পরে নির্ধারিত ফরমে প্রধান তথ্য কমিশনার বরাবর অভিযোগ দায়ের করি। এ ছাড়া এ প্রকৌশলী তার বন্ধুর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নানা কৌশলে কাজ দিচ্ছেন এবং দুই বন্ধু মিলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন বলেন, ‘কোনো তথ্য নিতে হলে সংশ্লিষ্ট এমপির অনুমতি লাগবে। তথ্য অধিকার ফরমে বা যেভাবেই আবেদন করেন না কেন, এমপির অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না।’
এ ব্যাপারে নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, আমি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সাংবাদিকদের তথ্য দিতে নিষেধ করিনি। নিয়ম অনুযায়ী তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যেক কর্মকর্তা বাধ্য। সরকারি প্রতিটি প্রজেক্টে কী কাজ হচ্ছে না হচ্ছে, কী যাচ্ছে, কী ব্যবহার হচ্ছে এবং তা মানসম্মত কি না বা নিয়মমাফিক হচ্ছে কি না, তা প্রত্যেক সাংবাদিকের জানা উচিত এবং জানার অধিকার রাখে। এটাই হচ্ছে তারেক জিয়ার রাজনীতি। নেই কোনো ভয়ভীতি, থাকবে না কোনো ধান্ধাবাজি ও দুর্নীতি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















