সংবাদ শিরোনাম ::
আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান হবে ৪ শতাংশ : বাংলাদেশ ব্যাংক কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি বিরোধী দলীয় নেতার রতনদিয়া রজনীকান্ত সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত মানিকনগর মডেল হাই স্কুলে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত নারী সাংবাদিকের মামলায় সুপ্রিম কোর্টেও হারলেন ট্রাম্প, দিতে হবে ৫ মিলিয়ন ডলার ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, নিহত ৮ দুর্বল ব্যাংকের মালিকানায় আগের মালিকরা ফিরতে পারবেন না : অর্থমন্ত্রী তিন মামলায় জামিন পেলেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ পরিপূর্ণ সুস্থতার দিকে মির্জা আব্বাস, চলছে পায়ের থেরাপি অর্থবিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস

শিক্ষক নিয়োগে ভয়ংকর জালিয়াতির অভিযোগ

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত প্রক্সি জালিয়াতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহার করে একাধিক অযোগ্য প্রার্থীকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুপারিশ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সরকারি চাকরিজীবী, মধ্যস্থতাকারী, প্রক্সি পরীক্ষার্থী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই চক্র কেবল প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই), চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই), সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত জালিয়াতি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানের শুরুতে হাতে আসে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম ও সাইরা বানু দম্পতির ছেলে আমান উল্লাহ নাহিনের বিষয়ে তথ্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই প্রার্থীর রোল নম্বর ছিল ৪৬২১০৬৫।

বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, আমান উল্লাহ নাহিন নিজে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। ১২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রক্সি জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি ১৫ নম্বর মেধা তালিকায় স্থান পান এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন।

তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুসন্ধান চালানো হয়। জানা যায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্যগত সনদ ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তার সঙ্গে কথা হলে প্রথমে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, তার পরিবর্তে অন্য একজন লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এ জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল।

তার দাবি, চুক্তি অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় সহযোগিতা করার কথা থাকলেও নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরে তাকে সহযোগিতা করেননি। এ কারণে মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে তিনি নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বলে দাবি করেন।

অভিযুক্ত প্রার্থীর এই বক্তব্যের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।

অভিযুক্ত প্রার্থীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে উঠে আসে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেনের নাম। তখন তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মেকানিক পদে কর্মরত ছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি প্রক্সি ও পরীক্ষা জালিয়াতির অভিযোগে আলোচিত ছিলেন। ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, ওই সময়ে একটি শক্তিশালী প্রক্সি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যেখানে আনোয়ারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।

কারামুক্তির পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় বসবাস করেন। তার জীবনযাত্রার মান ও সম্পদ নিয়ে স্থানীয় মহলে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল এলাকার মোজাম্মেল হকের পুত্র মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম (৩০) এর নাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনিই আমান উল্লাহ নাহিনের পক্ষে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিপাহী পদে কর্মরত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অন্য প্রার্থীর হয়ে প্রক্সি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

সূত্রগুলো দাবি করেছে, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একটি নিয়োগ পরীক্ষাতেও তিনি অন্য এক প্রার্থীর পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া একাধিক চাকরিপ্রত্যাশী জানান, চক্রটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়। সাধারণত আর্থিকভাবে সচ্ছল বা সরকারি চাকরিতে আগ্রহী প্রার্থীদের টার্গেট করা হয়।

৮ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দক্ষ ব্যক্তিদের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেও পরীক্ষায় জালিয়াতি করা হয়। পরবর্তীতে চুক্তির অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়।

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে অভিযোগ ওঠে, চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আলোচনায় আসার পর আনোয়ার হোসেনকে দ্রুত হাটহাজারী থেকে কর্ণফুলী উপজেলায় বদলি করা হয়।

যদিও বদলির কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

একটি প্রশাসনিক সূত্র দাবি করেছে, প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া এবং চাকরি বহাল রাখার আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্ত প্রার্থীর কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে অফিসে এসে জেনে যাবেন।”

তিনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার বা স্বীকার কোনোটিই স্পষ্টভাবে করেননি।

মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমান অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

অন্যদিকে মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেন এবং বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন ভালো জানেন।

এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আ. মান্নান বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। প্রক্সির মাধ্যমে কেউ সরকারি চাকরি পেয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদ ইসলাম সুমন বলেন, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে জালিয়াতি, ভুয়া নথি ব্যবহার, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির আওতায় গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তার মতে, প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি লাভের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বাতিল হতে পারে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান হবে ৪ শতাংশ : বাংলাদেশ ব্যাংক

শিক্ষক নিয়োগে ভয়ংকর জালিয়াতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০৭:২৬:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত প্রক্সি জালিয়াতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহার করে একাধিক অযোগ্য প্রার্থীকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুপারিশ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সূত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সরকারি চাকরিজীবী, মধ্যস্থতাকারী, প্রক্সি পরীক্ষার্থী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই চক্র কেবল প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই), চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই), সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত জালিয়াতি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানের শুরুতে হাতে আসে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম ও সাইরা বানু দম্পতির ছেলে আমান উল্লাহ নাহিনের বিষয়ে তথ্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই প্রার্থীর রোল নম্বর ছিল ৪৬২১০৬৫।

বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, আমান উল্লাহ নাহিন নিজে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। ১২ লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রক্সি জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি ১৫ নম্বর মেধা তালিকায় স্থান পান এবং মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন।

তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুসন্ধান চালানো হয়। জানা যায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্যগত সনদ ও ডোপ টেস্টের রিপোর্ট সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন।

পরবর্তীতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তার সঙ্গে কথা হলে প্রথমে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, তার পরিবর্তে অন্য একজন লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এ জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল।

তার দাবি, চুক্তি অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় সহযোগিতা করার কথা থাকলেও নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরে তাকে সহযোগিতা করেননি। এ কারণে মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে তিনি নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বলে দাবি করেন।

অভিযুক্ত প্রার্থীর এই বক্তব্যের অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।

অভিযুক্ত প্রার্থীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে উঠে আসে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেনের নাম। তখন তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে মেকানিক পদে কর্মরত ছিল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি প্রক্সি ও পরীক্ষা জালিয়াতির অভিযোগে আলোচিত ছিলেন। ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, ওই সময়ে একটি শক্তিশালী প্রক্সি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যেখানে আনোয়ারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।

কারামুক্তির পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় বসবাস করেন। তার জীবনযাত্রার মান ও সম্পদ নিয়ে স্থানীয় মহলে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল এলাকার মোজাম্মেল হকের পুত্র মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম (৩০) এর নাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনিই আমান উল্লাহ নাহিনের পক্ষে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিপাহী পদে কর্মরত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অন্য প্রার্থীর হয়ে প্রক্সি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

সূত্রগুলো দাবি করেছে, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের একটি নিয়োগ পরীক্ষাতেও তিনি অন্য এক প্রার্থীর পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া একাধিক চাকরিপ্রত্যাশী জানান, চক্রটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়। সাধারণত আর্থিকভাবে সচ্ছল বা সরকারি চাকরিতে আগ্রহী প্রার্থীদের টার্গেট করা হয়।

৮ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দক্ষ ব্যক্তিদের প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেও পরীক্ষায় জালিয়াতি করা হয়। পরবর্তীতে চুক্তির অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়।

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে অভিযোগ ওঠে, চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আলোচনায় আসার পর আনোয়ার হোসেনকে দ্রুত হাটহাজারী থেকে কর্ণফুলী উপজেলায় বদলি করা হয়।

যদিও বদলির কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

একটি প্রশাসনিক সূত্র দাবি করেছে, প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া এবং চাকরি বহাল রাখার আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্ত প্রার্থীর কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে অফিসে এসে জেনে যাবেন।”

তিনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার বা স্বীকার কোনোটিই স্পষ্টভাবে করেননি।

মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বর্তমান অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

অন্যদিকে মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেন এবং বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন ভালো জানেন।

এই প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আ. মান্নান বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। প্রক্সির মাধ্যমে কেউ সরকারি চাকরি পেয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদ ইসলাম সুমন বলেন, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা প্রতারণা, পরিচয় গোপন করে জালিয়াতি, ভুয়া নথি ব্যবহার, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং দুর্নীতির আওতায় গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তার মতে, প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি লাভের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বাতিল হতে পারে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।