সংবাদ শিরোনাম ::
রূপগঞ্জে ১% বরাদ্দের কোটি টাকা ‘লুটপাট’

রূপগঞ্জে ১% বরাদ্দের কোটি টাকা ‘লুটপাট’: ইউএনও ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক ১% বরাদ্দের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.সাইফুল ইসলাম এবং উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেনের দিকে।

স্থানীয় সূত্র, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও তথ্য না পাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে বাস্তবে নামমাত্র কাজ সম্পন্ন করে সরকারি কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে এই নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম নিজেকে বিএনপির মতাদর্শী ও সাবেক ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে দাম্ভিকতার সহিত কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে বিশাল পন্ডিত আর পালোয়ান জাহির করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ১% বরাদ্দের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলায় সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র মতে জানা যায়, কাগজে যে পরিমাণ কাজ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল নেই। কোথাও কাজ অসম্পূর্ণ, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, আবার কোথাও প্রকল্পের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের নিকট ১% বরাদ্দের প্রকল্প ও অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জানতে তার উপজেলা অফিসে সরেজমিনে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে তার মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল দিলেও তিনি ফোন কলটি রিসিভ করেননি। এই বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেনের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কোন মন্তব্য নেই। আমাকে ইউএনও স্যার বললে আমি যে কোন বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবো।
তিনি আরো বলেন, আমি যতোটুকু জানি ১% এর যে বরাদ্দ এসেছে, সব অর্থ সকল ইউনিয়ন পরিষদে ভাগ করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আমার কাছে এই বরাদ্দের কোনো তথ্য নেই। আপনি ইউনিয়নগুলোতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন কিংবা ইউএনও স্যারের সাথে যোগাযোগ করেন। ইউএনও স্যার অনুমতি না দিলে আমি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারবো না।

উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেন আরও বলেন, আমি তো এই তথ্য দেওয়ার কেউ না। এখানে আমরা সবাই ইউএনও স্যারের অধীনে কাজ করি। উপজেলা বিষয়ে স্যার যা বলবেন, তাই হবে।
তিনি আরও বলেন,আপনি মাথা গরম করার দরকার নেই, আমি ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাবো। কিন্তু পরে আর কোনো তথ্য বা সমাধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে ইউএনও মো. সাইফুল ইসলামকে উদ্দেশ্য করে তথ্য অধিকার আইনের ‘ক’ ফরমে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন রেখে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বিশেষ সূত্রে জানা যায়, ১% বরাদ্দের বড় একটি অংশ কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে নামমাত্র কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ইউএনওর অনুমোদন, উপজেলা প্রকৌশলীর সহযোগিতা এবং কিছু ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন স্বচ্ছ হতো, তাহলে তথ্য গোপনের প্রয়োজন হতো না। বরং তথ্য প্রকাশে অনীহাই দুর্নীতির বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তারা দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি অর্থ জনগণের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হলেও যদি তা ব্যক্তিস্বার্থে লুটপাট হয়, তাহলে উন্নয়ন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে—বাস্তবে নয়।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার এই ১% বরাদ্দের কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, কারা জড়িত, কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে—তা উদঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিরোধী দলের আসনে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থে‌কে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ

রূপগঞ্জে ১% বরাদ্দের কোটি টাকা ‘লুটপাট’

রূপগঞ্জে ১% বরাদ্দের কোটি টাকা ‘লুটপাট’: ইউএনও ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:০০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক ১% বরাদ্দের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.সাইফুল ইসলাম এবং উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেনের দিকে।

স্থানীয় সূত্র, সরেজমিন অনুসন্ধান এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও তথ্য না পাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে বাস্তবে নামমাত্র কাজ সম্পন্ন করে সরকারি কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে এই নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম নিজেকে বিএনপির মতাদর্শী ও সাবেক ছাত্রদল নেতা পরিচয়ে দাম্ভিকতার সহিত কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেকে বিশাল পন্ডিত আর পালোয়ান জাহির করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ১% বরাদ্দের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলায় সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র মতে জানা যায়, কাগজে যে পরিমাণ কাজ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে মিল নেই। কোথাও কাজ অসম্পূর্ণ, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, আবার কোথাও প্রকল্পের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের নিকট ১% বরাদ্দের প্রকল্প ও অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য জানতে তার উপজেলা অফিসে সরেজমিনে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে তার মুঠোফোনে অসংখ্যবার কল দিলেও তিনি ফোন কলটি রিসিভ করেননি। এই বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেনের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কোন মন্তব্য নেই। আমাকে ইউএনও স্যার বললে আমি যে কোন বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবো।
তিনি আরো বলেন, আমি যতোটুকু জানি ১% এর যে বরাদ্দ এসেছে, সব অর্থ সকল ইউনিয়ন পরিষদে ভাগ করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আমার কাছে এই বরাদ্দের কোনো তথ্য নেই। আপনি ইউনিয়নগুলোতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন কিংবা ইউএনও স্যারের সাথে যোগাযোগ করেন। ইউএনও স্যার অনুমতি না দিলে আমি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারবো না।

উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেন আরও বলেন, আমি তো এই তথ্য দেওয়ার কেউ না। এখানে আমরা সবাই ইউএনও স্যারের অধীনে কাজ করি। উপজেলা বিষয়ে স্যার যা বলবেন, তাই হবে।
তিনি আরও বলেন,আপনি মাথা গরম করার দরকার নেই, আমি ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাবো। কিন্তু পরে আর কোনো তথ্য বা সমাধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে ইউএনও মো. সাইফুল ইসলামকে উদ্দেশ্য করে তথ্য অধিকার আইনের ‘ক’ ফরমে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন রেখে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বিশেষ সূত্রে জানা যায়, ১% বরাদ্দের বড় একটি অংশ কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে নামমাত্র কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ইউএনওর অনুমোদন, উপজেলা প্রকৌশলীর সহযোগিতা এবং কিছু ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন স্বচ্ছ হতো, তাহলে তথ্য গোপনের প্রয়োজন হতো না। বরং তথ্য প্রকাশে অনীহাই দুর্নীতির বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তারা দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের জরুরি তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি অর্থ জনগণের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হলেও যদি তা ব্যক্তিস্বার্থে লুটপাট হয়, তাহলে উন্নয়ন শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে—বাস্তবে নয়।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার এই ১% বরাদ্দের কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, কারা জড়িত, কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে—তা উদঘাটনে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।