বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিল প্রক্রিয়া কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে একটি ব্যবসা শুরু থেকে পণ্য আমদানি বা রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যেখানে প্রায় ৩৫৫ দিন সময় লাগে, সেখানে তা কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। একইসঙ্গে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে এসএমই খাতকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বুধবার (২৪ জুন) অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ আলম। মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
মূল প্রবন্ধে এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপলক্ষে এসএমই খাতের উন্নয়নে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দেওয়া ১১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৬টি প্রস্তাব সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর সংক্রান্ত ১২টি, ভ্যাট সংক্রান্ত ৫টি এবং শুল্ক সংক্রান্ত ১৯টি প্রস্তাব রয়েছে।
তিনি জানান, প্রথমবারের মতো বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এ খাতের জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
তবে এসএমই ফাউন্ডেশনের মতে, জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২, খসড়া জাতীয় এসএমই নীতিমালা ২০২৬, ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি ২০২৩ এবং রপ্তানি নীতিমালা ২০২৪-২০২৭-এ এসএমই খাতের জন্য বিভিন্ন কর ছাড় ও প্রণোদনার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এসব সুবিধা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসএমই খাতের জন্য ঘোষিত কর ও শুল্ক সুবিধাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এসএমই খাতের জন্য আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত বিদ্যমান বিচ্ছিন্ন সুবিধাগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে পৃথক আইন বা এসআরও প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে এসএমই ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা ২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের জন্য অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া সরকারের ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতের জন্য প্রস্তাবিত ৩০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে এসএমই ফাউন্ডেশনের জন্য কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি জানানো হয়। এসএমই ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ১৭৭টি শিল্প ক্লাস্টারে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বছরে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই)। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এ খাতেই সৃষ্টি হয়েছে এবং এখানে তিন কোটির বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
এসএমই ফাউন্ডেশন জানায়, দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ খাত। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাটি প্রায় ২২ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন সহায়তা দিয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















