ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুলিশ প্রশাসনের ওপর ভর করে যারা ক্ষমতার অপব্যবহারের পাহাড় গড়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম এক ‘নেপথ্য কারিগর’ ডিএমপির ডিবি সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সাবেক কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সুমন। পতিত সরকারের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিবি হারুন এবং ডিআইজি হাবিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ‘পোষ্য পুত্র’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এবার একের পর এক চোখ কপালে ওঠার মতো চাঞ্চল্যকর অপকর্মের খতিয়ান বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইবার অপরাধ দমনের আড়ালে নাজমুল গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক অপরাধ সিন্ডিকেট। যেখানে বিরোধী মতের দমন, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি, কোটি কোটি টাকার সাইবার বাণিজ্য এবং নারীদের ব্ল্যাকমেইল করার এক অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছিল।
**কোটি টাকার ফ্ল্যাট ও বেনামে অঢেল সম্পত্তি**ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাজমুল ইসলাম ও তার সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তৎকালীন সময়েই রাজধানীর অভিজাত এলাকা সিদ্ধেশ্বরীতে প্রায় দেড় কোটি টাকা ক্যাশ দিয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিজের অবৈধ উপার্জনকে আড়াল করতে স্ত্রী ও বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বেনামে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিঘার পর বিঘা জমি এবং কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
**সাইবার ক্রাইমের আড়ালে ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল’ ও কোটি টাকার বাণিজ্য**সাইবার প্রযুক্তিতে পারদর্শী হওয়ার সুবাদে নাজমুল জানতেন কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা হ্যাক করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, টার্গেট করা ব্যক্তিদের ফেসবুক আইডি ও ব্যক্তিগত ডিভাইস হ্যাক করে তাদের অত্যন্ত গোপনীয় ছবি, চ্যাট হিস্ট্রি বা তথ্য সংগ্রহ করতেন তিনি। পরবর্তীতে সেইসব সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্লাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। বিকাশ প্রতারণার মাধ্যমেও একাধিক সিন্ডিকেটকে শেল্টার দিয়ে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ বাণিজ্য করেছেন, যা পরবর্তীতে তিনি ঘনিষ্ঠ মহলে স্বীকারও করেছিলেন। ডিবিতে থাকাকালীন তার বিশ্বস্ত দুজন ইন্সপেক্টর তার পুরো ক্যাশিয়ার বা সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করতেন বলে জানা গেছে।
**মিথ্যা মামলার চার্জশিট ও গুমের নেপথ্য সহযোগী**ফ্যাসিস্ট সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করতে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী, বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের গুম, ধরে এনে নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোটাই ছিল নাজমুলের প্রধান কাজ। ইন্সপেক্টর শওকতের মতো কতিপয় ‘খাস চামচা’ ও অনুগত অফিসারদের দিয়ে ঢাকা শহরে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি এবং একের পর এক সাজানো ও কাল্পনিক মামলার চার্জশিট জমা দিয়েছেন তিনি।
**ভিআইপি হোটেল সংস্কৃতি ও নারী কেলেঙ্কারি**নাজমুলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দাপটে ভয়াবহ নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। গুলশানের বিভিন্ন নামী-দামি ও বিলাসবহুল হোটেলে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে রাত কাটানো এবং ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে ফেলে নারীদের অনৈতিক সুবিধা দিতে বাধ্য করার একাধিক প্রমাণ রয়েছে। এমনকি তার এই অনৈতিক নেটওয়ার্ক অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বলয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
**ধামাচাপা দেওয়ার সিন্ডিকেট ও বর্তমান পরিস্থিতি**বিগত সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ জমা পড়লেও সাবেক ডিআইজি হাবিবের সরাসরি হস্তক্ষেপে কোনো কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে মামলা বা ব্যবস্থা নিতে সাহস পাননি। ডিএমপির ভেতরেই তাকে রক্ষা করতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করত।তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যেই তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ।
**জনগণের দাবি ও তদন্ত**বর্তমানে দেশের সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, শুধু বরখাস্ত নয়—নাজমুল ইসলাম, তার ক্যাশিয়ার ইন্সপেক্টর শওকতসহ এই চক্রের প্রতিটি সদস্যকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। একই সাথে তাদের নামে-বেনামে থাকা সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















