ঢাকা ১২:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কাস্টমস কর্মকর্তা কাজী সুলতানা দম্পতির ‘সম্পদের পাহাড়’, উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আতীকুজ্জামানের নামে-বেনামে ৫০ কোটি টাকার সম্পদ মাদারীপুর বিআরটিএর সামসুদ্দীনের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ৪৮৫ গ্রেপ্তার, মামলা ৫০ স্টার্ক-আফ্রিদিকে ছাড়িয়ে নতুন কীর্তি রশিদ খানের বরগুনার উন্নয়নই আমাদের অঙ্গীকার: চীফ হুইপ নুরুল ইসলাম মণি ড্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির নারী এমপিকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ র‍্যাবের নাম বদলে আসছে এসআরবি অফিস টাইমে ক্লিনিকে রোগী দেখছিলেন সরকারি চিকিৎসক, লাইসেন্স বাতিল ও বরখাস্তের নির্দেশ

গাউকের মুরাদ ‘এম’ চিহ্ন দিয়ে চলে ঘুষের রাজত্ব, শত কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (গাউক)-এ বদলি হওয়া ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র দশ বছরের সরকারি চাকরি জীবনে তিনি কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার বিলাসবহুল জীবনযাপন, ব্যক্তিগত গাড়ি, লাখ টাকার ঘড়ি, এবং একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
২০১৫ সালে রাজউকে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। ২০২২ সালে দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যখন রাজউকের ৬৭ জন ইমারত পরিদর্শককে বদলি করা হয়, তখন লটারির মাধ্যমে মুরাদ আলীকে জোন-২ থেকে জোন-৫-এ বদলি করা হয়েছিল। তবে একটি সূত্র জানায়, রাজউকে দুর্নীতির দায় এড়াতে ২০২০ সালে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে তাকে সেখানে বদলি করা হয়। আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সহোদর হওয়ায় গাউকে তিনি বিশেষ প্রভাব খাটিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে হাতের মুঠোয় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও মুরাদ আলী তার ১০ বছরের চাকরিজীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় তার চারটি বাড়ি এবং শহরে আরও সাতটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সম্পদ তিনি নিজ নামে না কিনে স্ত্রী রোকসানা পারভীন, বাবা আশরাফুল আলম খান, বোন মাহমুদা আক্তার এবং বন্ধু আনিসুর রহমানের নামে কিনেছেন। এছাড়াও তিনি আবাসন প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করেছেন এবং ফাইল আটকে রেখে ভবনের মালিকানা শেয়ারও লিখে নেন। চাকরি ছাড়া তার বৈধ আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই।
মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, তিনি ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের প্রতিটি ফাইলে একটি বিশেষ চিহ্ন ‘এম’ লিখে দেন। এই ‘এম’ চিহ্ন ছাড়া কোনো ফাইলই অনুমোদন পায় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বিশেষ চিহ্নটি তার ঘুষ লেনদেনের একটি গোপন সংকেত, যা দিয়ে তিনি ভবন মালিকদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করেন।
মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে একাধিক নকশা জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
জয়দেবপুর মৌজায় ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় তিনি ১৩ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন। বরুদা এলাকার ৩৬ শতাংশ জমিতে খন্দকার নাজিমউদ্দিন গং-কে এই ভূমি ছাড়পত্র প্রদান করা হয় (স্মারক নং-১৫০৫.২৪.১৬৮১)।
কাজী শায়লা শারমিন গং-এর একটি নকশা অনুমোদনের জন্য ১১ তলা ভবন নির্মাণের শর্ত অনুযায়ী ২০ ফুট রাস্তা প্রয়োজন হলেও, মুরাদ আলী টাকার বিনিময়ে ১০ ফুট রাস্তাকে ২০ ফুট দেখিয়ে অনুমোদন দেন (নথি নং ৬২/২৫)।
তিনি ত্রুটিপূর্ণ জমিতে ‘বিশেষ প্রকল্প’ দেখিয়ে আইরিশ ফ্যাশন লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন ভবনগুলোকে ছাড়পত্র দিয়েছেন। এছাড়াও, লুফর রহমান এবং মো. আব্দুস সোবাহান গং-এর নামে জমা হওয়া দুটি ফাইলে (নথি নং ১৪৩৫/২৪ এবং ১৫৯/২৫) ছাড়পত্র জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে।
মুরাদ আলী রাজউকের পুরোনো নথি ধরে ধরে নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে ভবন মালিকদের নোটিশ পাঠাতেন। তিনি মোবাইল ফোনে ভবন ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেন এবং পরবর্তীতে কৌশলে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতেন। এমন অসংখ্য অভিযোগের কপি পাওয়া গেছে।
এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে মুরাদ আলী ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাস্টমস কর্মকর্তা কাজী সুলতানা দম্পতির ‘সম্পদের পাহাড়’, উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ

গাউকের মুরাদ ‘এম’ চিহ্ন দিয়ে চলে ঘুষের রাজত্ব, শত কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য

আপডেট সময় ১১:৪০:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (গাউক)-এ বদলি হওয়া ইমারত পরিদর্শক মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র দশ বছরের সরকারি চাকরি জীবনে তিনি কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার বিলাসবহুল জীবনযাপন, ব্যক্তিগত গাড়ি, লাখ টাকার ঘড়ি, এবং একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
২০১৫ সালে রাজউকে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। ২০২২ সালে দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যখন রাজউকের ৬৭ জন ইমারত পরিদর্শককে বদলি করা হয়, তখন লটারির মাধ্যমে মুরাদ আলীকে জোন-২ থেকে জোন-৫-এ বদলি করা হয়েছিল। তবে একটি সূত্র জানায়, রাজউকে দুর্নীতির দায় এড়াতে ২০২০ সালে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে তাকে সেখানে বদলি করা হয়। আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের সহোদর হওয়ায় গাউকে তিনি বিশেষ প্রভাব খাটিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে হাতের মুঠোয় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও মুরাদ আলী তার ১০ বছরের চাকরিজীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় তার চারটি বাড়ি এবং শহরে আরও সাতটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সম্পদ তিনি নিজ নামে না কিনে স্ত্রী রোকসানা পারভীন, বাবা আশরাফুল আলম খান, বোন মাহমুদা আক্তার এবং বন্ধু আনিসুর রহমানের নামে কিনেছেন। এছাড়াও তিনি আবাসন প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করেছেন এবং ফাইল আটকে রেখে ভবনের মালিকানা শেয়ারও লিখে নেন। চাকরি ছাড়া তার বৈধ আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই।
মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, তিনি ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের প্রতিটি ফাইলে একটি বিশেষ চিহ্ন ‘এম’ লিখে দেন। এই ‘এম’ চিহ্ন ছাড়া কোনো ফাইলই অনুমোদন পায় না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বিশেষ চিহ্নটি তার ঘুষ লেনদেনের একটি গোপন সংকেত, যা দিয়ে তিনি ভবন মালিকদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করেন।
মুরাদ আলীর বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে একাধিক নকশা জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
জয়দেবপুর মৌজায় ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০২২-২০৩৫) অনুযায়ী চিহ্নিত জলাশয় এলাকায় তিনি ১৩ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন। বরুদা এলাকার ৩৬ শতাংশ জমিতে খন্দকার নাজিমউদ্দিন গং-কে এই ভূমি ছাড়পত্র প্রদান করা হয় (স্মারক নং-১৫০৫.২৪.১৬৮১)।
কাজী শায়লা শারমিন গং-এর একটি নকশা অনুমোদনের জন্য ১১ তলা ভবন নির্মাণের শর্ত অনুযায়ী ২০ ফুট রাস্তা প্রয়োজন হলেও, মুরাদ আলী টাকার বিনিময়ে ১০ ফুট রাস্তাকে ২০ ফুট দেখিয়ে অনুমোদন দেন (নথি নং ৬২/২৫)।
তিনি ত্রুটিপূর্ণ জমিতে ‘বিশেষ প্রকল্প’ দেখিয়ে আইরিশ ফ্যাশন লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন ভবনগুলোকে ছাড়পত্র দিয়েছেন। এছাড়াও, লুফর রহমান এবং মো. আব্দুস সোবাহান গং-এর নামে জমা হওয়া দুটি ফাইলে (নথি নং ১৪৩৫/২৪ এবং ১৫৯/২৫) ছাড়পত্র জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে।
মুরাদ আলী রাজউকের পুরোনো নথি ধরে ধরে নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে ভবন মালিকদের নোটিশ পাঠাতেন। তিনি মোবাইল ফোনে ভবন ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেন এবং পরবর্তীতে কৌশলে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতেন। এমন অসংখ্য অভিযোগের কপি পাওয়া গেছে।
এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে মুরাদ আলী ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি।