সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা, রপ্তানি খাতকে সহায়তা দিতে রিজার্ভ থেকে ইডিএফের আকার বাড়ানো এবং ব্যবসার জন্য ঋণপ্রবাহ সহজ করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও ব্যাংক ঋণের চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসব প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
বৈঠকে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত উপেক্ষা করে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বাড়ানোর দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে তারা সুদের হার কমিয়ে এক অঙ্কে নামানো, ব্যাংকের একক গ্রাহক ঋণসীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা এবং অনিচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের জন্য পুনর্বাসন সহায়তার প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া আমদানির জন্য ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং সরকারি ঋণ কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিও তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। এরপরও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে যেন ডলারের বাজারে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য আমরা ইডিএফ তহবিলের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার অনুরোধ জানান। গভর্নর কথা দিয়েছেন, তিনি ধীরে ধীরে তা বাড়াবেন বলে জানান তিনি।
এফবিসিসিআই মহাসচিব জানান, গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে সুদহার কমানো ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার থাকা ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের যেন স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার অনুরোধ জানান।
কোন কোন ব্যাংকের খেলাপি ৯০ শতাংশ হয়েছে। যদিও ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ১০ শতাংশের নিচে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেয় বিগত দুই গভর্নর আইএমএফের ঋণের কিস্তি নিশ্চিত করেছিলেন। সেই ঋণ চলমান রয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করলে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের অবশিষ্ট কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যাওয়ায় শঙ্কা আছে।
এফবিসিসিআই লিখিতভাবে জানায়, দেশের অর্থনীতিতে অনাদায়ি বা খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে গভর্নরকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ে ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এফবিসিসিআই বলছে, খেলাপি ঋণ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি করছে। তাই অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ দ্রুত কমিয়ে আনা জরুরি। সংগঠনটি কখনোই ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের পক্ষে নয়। তবে ব্যবসায়িক ঝুঁকি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে যারা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণ খেলাপি হয়েছেন, তাদের জন্য পুনর্বাসনমূলক নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করে এফবিসিসিআই। এতে করে এসব উদ্যোক্তা পুনরায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়বে।
একইসঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও জোর দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যান, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করলে সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।
এফবিসিসিআই আশা প্রকাশ করেছে, যথাযথ নীতি সহায়তা ও কঠোর নজরদারির সমন্বয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সহায়তা জোরদারের দাবি ও ব্যাংকিং খাতরে সুদ কমানে জরুরি।
বৈঠকে এফবিসিসিআই তুলা অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে ছিল দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে সহায়তা, ঋণ পুনঃতফসিল সহজীকরণ, সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা প্যাকেজ নিশ্চিত করা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি, সরকারি ঋণ কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন বাড়ানো, প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদান, ব্যাংকে হেল্পডেস্ক চালু, গ্রিন ফাইন্যান্সিং জোরদার করা, সৌরশক্তি ব্যবহারে স্বল্পসুদে ঋণ, শিল্পখাতের ব্যাংকিং সমস্যার দ্রুত সমাধানে কমিটি গঠন।
এদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বর্তমানে নীতি সুদের হার ১০ শতাংশ রয়েছে। এর ফলে ঋণের ওপর সুদহার প্রায় ১৬-১৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি জানান, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পণ্য, সেবা ও রপ্তানি বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং এ অবস্থা উত্তরণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই, বিশেষ করে দেশের সিএসএমই খাত ও কৃষি ব্যবস্থাপনা উপর অধিক হারে গুরুত্বারোপ করতে হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলে ছিলেন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এর সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-এর সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম সরকার, বিজিএমইএ এর পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান, এফবিসিসিআিইর সাবেক পরিচালক গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী (খোকন), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম, বারভিডার সভাপতি মো. আবদুল হক, উইমেন অ্যাসোসিয়েশন অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ওয়েব) এর সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ জুয়েলারি অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন, বাংলাদেশ সিএনজি মেশিনারিজ অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকির হোসেন নয়ন, বাংলাদেশ সুপার মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 
























