ঢাকা ০৭:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মুক্তিপণ দিয়েও মেলেনি মুক্তি, ফরিদপুরে শিকলবন্দি নিলয় উদ্ধার; গ্রেফতার- ৩ পীরগঞ্জে জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ উদ্বোধন সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন অসুস্থ, পা অবশ হওয়ায় চলাফেরা সীমিত ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় চরম ধস নেমেছিল : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে কালুখালী উপজেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত বাংলাদেশে প্রতিটি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে : আইনমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান প্রস্তাব হাসনাতের বরগুনায় নানা বাড়িতে বেড়াতে এসে নদীর স্রোতে নিখোঁজ দশম শ্রেণির ছাত্রী জুই র‍্যালি ও পুরস্কার বিতরণে দৌলতখানে জাতীয় মৎস্য পক্ষ উদযাপিত আত্রাইয়ে নানার বাড়িতে বেড়াতে এসে নদীতে পড়ে দুই বছরের শিশুর মৃত্যু

ইলোরা ও অরূপ কর্মকার সচিবালয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া দুই ভাই -বোন বহাল তবিয়তে

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে কোটা সুবিধায় সরকারি চাকরি গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের অভিযোগে সচিবালয়ে কর্মরত দুই ভাই-বোনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইলোরা কর্মকার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক অরূপ কর্মকার। তাদের বাবা মৃত গনেশ চন্দ্র কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা সনদটি ইতোমধ্যে জাল প্রমাণিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তা বাতিল করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রামের বাসিন্দা গনেশ চন্দ্র কর্মকার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও প্রভাব খাটিয়ে বেসামরিক গেজেটে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করান। এই ভুয়া সনদের ভিত্তিতে তার পরিবার বছরের পর বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে আসছিল।
এই সনদ ব্যবহার করেই ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ইলোরা কর্মকার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হন। একইভাবে, তার ভাই অরূপ কর্মকার ২০১৭ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
এবিষয়ে গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মী ইমতিয়াজ কবীর গত ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন (স্মারক নং–৯৪৯)। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গনেশ চন্দ্র কর্মকার একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।
প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় জামুকা কর্তৃপক্ষ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য তলব করে। শুনানিতে অভিযুক্ত অরূপ কর্মকার কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অনুসন্ধানে গনেশ চন্দ্র কর্মকারের গেজেট (নং–৭৬৮) এবং ব্যক্তিগত তথ্যে মারাত্মক অসংগতি ধরা পড়ে।
গেজেটে ‘গনেশ চন্দ্র কর্মকার’ এবং ‘দনেশ চন্দ্র কর্মকার’—এই দুটি ভিন্ন নাম পাওয়া যায়। পিতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানায় গরমিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর দুটি ভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে দুটি মৃত্যু সনদ ইস্যু করা হয়, যা আইনত অবৈধ।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, গনেশ চন্দ্র কর্মকার কখনো মুক্তিযুদ্ধে যাননি এবং ‘দনেশ চন্দ্র কর্মকার’ নামে এলাকায় কেউ ছিলেন না।
সকল তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ১০১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গনেশ চন্দ্র কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা গেজেটটি (নং–৭৬৮) আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে।
এদিকে অরূপ কর্মকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত অনৈতিকতার একাধিক গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। সামান্য কর্মচারী হয়েও তিনি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শ্যালিকার স্বামী স্বপন বর্মনকে মারধর এবং জনি সিং নামের এক ব্যক্তিকে সূত্রাপুর থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে জানা গেছে।
গনেশ চন্দ্র কর্মকারের সনদ বাতিলের পর তার সন্তানদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত চাকরি ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে। তাদের দাবিগুলো হলো: ১. গনেশ চন্দ্র কর্মকারের পরিবারকে দেওয়া সকল মুক্তিযোদ্ধা সুবিধা স্থায়ীভাবে বাতিল করা।২. ইলোরা কর্মকার ও অরূপ কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় প্রাপ্ত নিয়োগ বাতিল করে তাদের চাকরিচ্যুত করা। ৩. অবৈধভাবে ভোগ করা সমস্ত ভাতা ও সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা। ৪. জালিয়াতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণা রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় ধরনের জালিয়াতি এবং এটি দেশের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মুক্তিপণ দিয়েও মেলেনি মুক্তি, ফরিদপুরে শিকলবন্দি নিলয় উদ্ধার; গ্রেফতার- ৩

ইলোরা ও অরূপ কর্মকার সচিবালয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া দুই ভাই -বোন বহাল তবিয়তে

আপডেট সময় ১২:৫০:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে কোটা সুবিধায় সরকারি চাকরি গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের অভিযোগে সচিবালয়ে কর্মরত দুই ভাই-বোনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইলোরা কর্মকার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক অরূপ কর্মকার। তাদের বাবা মৃত গনেশ চন্দ্র কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা সনদটি ইতোমধ্যে জাল প্রমাণিত হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তা বাতিল করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রামের বাসিন্দা গনেশ চন্দ্র কর্মকার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও প্রভাব খাটিয়ে বেসামরিক গেজেটে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করান। এই ভুয়া সনদের ভিত্তিতে তার পরিবার বছরের পর বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে আসছিল।
এই সনদ ব্যবহার করেই ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ইলোরা কর্মকার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে যোগদান করেন এবং পরে পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হন। একইভাবে, তার ভাই অরূপ কর্মকার ২০১৭ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ লাভ করেন।
এবিষয়ে গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মী ইমতিয়াজ কবীর গত ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন (স্মারক নং–৯৪৯)। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গনেশ চন্দ্র কর্মকার একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।
প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় জামুকা কর্তৃপক্ষ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে উভয় পক্ষকে শুনানির জন্য তলব করে। শুনানিতে অভিযুক্ত অরূপ কর্মকার কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অনুসন্ধানে গনেশ চন্দ্র কর্মকারের গেজেট (নং–৭৬৮) এবং ব্যক্তিগত তথ্যে মারাত্মক অসংগতি ধরা পড়ে।
গেজেটে ‘গনেশ চন্দ্র কর্মকার’ এবং ‘দনেশ চন্দ্র কর্মকার’—এই দুটি ভিন্ন নাম পাওয়া যায়। পিতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানায় গরমিল পাওয়া যায়। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর দুটি ভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে দুটি মৃত্যু সনদ ইস্যু করা হয়, যা আইনত অবৈধ।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, গনেশ চন্দ্র কর্মকার কখনো মুক্তিযুদ্ধে যাননি এবং ‘দনেশ চন্দ্র কর্মকার’ নামে এলাকায় কেউ ছিলেন না।
সকল তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ১০১তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গনেশ চন্দ্র কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা গেজেটটি (নং–৭৬৮) আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে।
এদিকে অরূপ কর্মকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত অনৈতিকতার একাধিক গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। সামান্য কর্মচারী হয়েও তিনি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার শ্যালিকার স্বামী স্বপন বর্মনকে মারধর এবং জনি সিং নামের এক ব্যক্তিকে সূত্রাপুর থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে জানা গেছে।
গনেশ চন্দ্র কর্মকারের সনদ বাতিলের পর তার সন্তানদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত চাকরি ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে। তাদের দাবিগুলো হলো: ১. গনেশ চন্দ্র কর্মকারের পরিবারকে দেওয়া সকল মুক্তিযোদ্ধা সুবিধা স্থায়ীভাবে বাতিল করা।২. ইলোরা কর্মকার ও অরূপ কর্মকারের মুক্তিযোদ্ধা পোষ্য কোটায় প্রাপ্ত নিয়োগ বাতিল করে তাদের চাকরিচ্যুত করা। ৩. অবৈধভাবে ভোগ করা সমস্ত ভাতা ও সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা। ৪. জালিয়াতি, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণা রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় ধরনের জালিয়াতি এবং এটি দেশের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।