চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রাম নিবাসী করিৎকর্মা অফিসার ফরিদপুর জেলার বহুল আলোচিত জেলা রেজিস্ট্রার ( D.R) শফিকুল ইসলাম। প্রথম দর্শনে নজদরকাঁড়া নায়কোচিত পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব মনে হলেও তাঁর ঘুষ দুর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্যের শিকড় রয়েছে অনেক গভীরে। ফরিদপুরে যোগদানের শুরু থেকেই তিনি লুটপাট বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আবির্ভূত।। তিনি ফরিদপুরে প্রতিমাসে বেতনের বাইরে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা। জেলা সদরসহ এখানে মোট সাব রেজিস্ট্রি অফিস আছে ৯ টি। সেগুলো হচ্ছে, ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মধুখালী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, নগরকান্দা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, ভাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, চরভদ্রাসন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বোয়ালমারী সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সদরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সালথা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস । প্রতিমাসে ওইসব সাব রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল সম্পাদন হয় ১০/১১ হাজার। আর এসব দলিল প্রতি মাসে তিনি তাঁর সহকারীর মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন ১ হাজার টাকা হিসেবে নাস্তা খরচের নামে কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলাম মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সাব রেজিস্ট্রার থাকাকালীন দূর্নীতির হাতেখড়ি শুরু করেন। এরপর পার্শ্ববর্তী এলকার তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কে দিয়ে মোটা অংকের দক্ষিনার বিনিময়ে তদবির করিয়ে ২০২১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। এবং তখন থেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে নামে বেনামে গড়ে তোলা শুরু করেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। উল্লেখযোগ্য সম্পদ হচ্ছে কল্যাণপুর ঢাকা বাসা নম্বর -১২. রোড নং -০২.ওয়ার্ড নং -১১.. ড্রিম হেভেন ভবনে বিলাস বহুল ফ্লাট রয়েছে। তার স্ত্রী সুরাইয়া ইসলাম এর নামে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি রয়েছে। যার গাড়ি নং – ঢাকা মেট্রো -গ- ২৫-৬১৬৬. তার দুই ছেলে মাহি . মুহিত এর নামে অবৈধ সম্পদের বিষয় অনুসন্ধান চলমান।
নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গা সদরে কাঠপট্টি এলাকায় চার তলা আলিশান বাড়ি এবং কার্পাসডাঙ্গা বাজারে মার্কেটসহ আরও একটি চার তলা ভবন।
আট কবর এলাকা: এখানে রয়েছে মার্কেটসহ দুই তলা ভবন। এছাড়া জগন্নাথপুর নিজ গ্রামেও রয়েছে বিলাসবহুল দুই তলা বাড়ি।
রাজধানী ও অন্যান্য জেলা: ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি ছাড়াও যশোর ও ঝিনাইদহে তার একাধিক বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।
বেনামি সম্পদ: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন তিনি।
ব্যবসা ও বিলাসিতা: ভাগিনা মোঃ হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন কোটি টাকার ‘নেহা ত্বহা ট্রেডার্স’। এছাড়া নিজের চলাচলের জন্য ব্যবহার করেন বিলাসবহুল প্রাইভেট কার।
এছাড়াও তিনি সংগোপনে ব্যবহার করেন একাধিক বেনামী ব্যাংক একাউন্ট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ই আগষ্ট ২০২৪ জুলাই আন্দোলনের মুখ শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে শফিকুল ইসলাম আইজিআর অফিসের অনুমতি ছাড়াই আত্মগোপন করেন।। সে সময় দীর্ঘদিন যাবৎ অনুপস্থিত থাকার কারণে ব্যাপক ক্ষোভে ফেটে পরে ভূক্তভোগী ও সচেতন মহল।
এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ২৪ সালের ১০ই অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকে তারই ছত্রছায়ায় ফরিদপুর সদর সাব রেজিস্ট্রার সহ জেলার অন্যান্য সাব রেজিস্ট্রার গন ঘুষ দূর্নীতির অপ্ররোধ্য প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। যা ছাত্র জনতার হাতে ধরাও খায় এবং দুদকেও মামলা দায়ের হয় সাব রেজিস্ট্রার দের নামে, কিন্তু এই সমস্ত দূর্নীতির মাস্টারমাইন্ড সুচতুর শফিকুল পর্দার আড়াল থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
এর আগে শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলাম ” জুলাই বিপ্লব দমন”” করার মানসে কতিপয় অস্ত্রধারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সাথে রাতের আঁধারে গভীর চক্রান্ত ও শলাপরামর্শে লিপ্ত হন। তাছাড়াও ছাত্র জনতার ওই আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বিশেষ মহলের ফোন পেয়ে মোটা অংকের টাকা লগ্নী করেন।
ওই সময় নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে দুর্নীতির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুস্পষ্ট অভিযোগ দাখিল করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণও সরবরাহ করেছেন। তবে, অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, অভিযোগ দাখিলের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুদক দৃশ্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
অভিযোগ করা হয়, জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রতি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গড়ে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়, যা না দিলে দলিল বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া, জেলার প্রতিটি উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়।
দুদকের ভূমিকা ও ‘ম্যানেজ’ করার গুঞ্জন
সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি হলো দুদকের কার্যক্রম নিয়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, তদন্ত প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দুদকের একটি প্রভাবশালী অংশ ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেছেন শফিকুল ইসলাম। ফলে ঝুলে আছে তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির ফাইল।
এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যাবহৃত নাম্বারে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জনমনে প্রশ্ন: খুুঁটির জোর কোথায়?
একটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও অতীতে এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে সরকারি মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান কর্মস্থল কিশোরগঞ্জেও তার এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ণ করবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
ভুক্তভোগীরা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভূক্তভোগী ও দলিল লেখক সমিতির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার অফিস শেষে তার সহকারী ও তাকে তল্লাশী করলে ” দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম” অবৈধ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করতে পারবে।
মোঃ মামুন হোসেন 
























