ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বয়স অপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সরকারি সুযোগ–সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও সচেতন মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শফিকুল ইসলামের জন্মসাল ১৯৬৫। সে হিসাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় বছর। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই বয়সে কোনো শিশুর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ কিংবা যুদ্ধ-সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব পালনের বাস্তবসম্মত সুযোগ ছিল না। অথচ সরকারি নথিতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শফিকুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা গ্রহণ করেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তী সময়ে পদোন্নতির মাধ্যমে জেলা রেজিস্ট্রারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিনি যে তথ্য ও পরিচয় ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা যাচাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রের দাবি, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বয়স, অবস্থান এবং সক্রিয় ভূমিকার বিষয়গুলো যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের মতে, পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার দাবি শুধু বিতর্কিত নয়, বরং তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে খাটো করার শামিল বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
চাকরিতে যোগদানের পর বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমি ও দলিল নিবন্ধন সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও ওঠে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন, দলিল নিবন্ধন ও অন্যান্য সেবায় নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হতো। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার কাজ নানা অজুহাতে বিলম্বিত করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত বা জাল দলিল নিবন্ধনের অভিযোগও উঠেছে তার দপ্তরের বিরুদ্ধে। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিক ও আইনি ঝুঁকিতে পড়েছেন, তেমনি সরকারও রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে। ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, এসব অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
শুধু অনিয়মই নয়, চাকরির আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজ জেলা ও আশপাশের এলাকায় তার নামে জমি ও স্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে, যার আর্থিক মূল্য সরকারি বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। জন্মসাল, শিক্ষা সনদ ও মুক্তিযোদ্ধা তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখলেই অভিযোগের সত্যতা অনেকাংশে যাচাই করা সম্ভব। তবে শফিকুল ইসলামের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন—এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক ও নাগরিক সংগঠনগুলো। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবময় ও স্পর্শকাতর বিষয়ে ভুয়া সনদের অভিযোগ দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলে তা রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিষয়টি নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। অথচ কেউ যদি শিশু বয়সে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে সরকারি চাকরি ও সুযোগ–সুবিধা ভোগ করে, তাহলে তা শুধু দুর্নীতি নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও চরম প্রতারণা।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ভূমি প্রশাসনের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















