ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাঠে নয় অফিসে তদন্ত, আপ্যায়নে ব্যস্ত উপপরিচালক সানোয়ার হোসেন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০২:০১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫৭৭ বার পড়া হয়েছে

কমিশন ছাড়া বিলে স্বাক্ষর করানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় এসে দায়িত্বশীল ভূমিকা না পালনের অভিযোগ উঠেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোশগল্প ও আপ্যায়নে সময় কাটিয়ে কোনো ধরনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ছাড়াই এলাকা ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

জানা গেছে, বিভিন্ন ঠিকাদার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিশকাতুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কমিশন আদায়, প্রকল্পের বিল ছাড়ে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবসহ একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছিল। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, তিনি ৫ জানুয়ারি দুপুরে সোনাইমুড়ী উপজেলায় এসে অভিযোগগুলো সরেজমিনে তদন্ত করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করবেন। পরদিন ৬ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, প্রকল্প সভাপতি ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়টি নোটিশে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত পিআইও মিশকাতুর রহমান এবং নোয়াখালী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদ আলম। তদন্ত কর্মকর্তা কার্যালয়ে প্রবেশের পরপরই আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত কার্যক্রম শুরু না করে দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন বলে অভিযোগ।

সেই সময় পিআইও কার্যালয়ে ফলমূল, বিস্কিট, চানাচুর, বাদাম ও চায়ের বিশেষ আয়োজন করা হয়। স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশ তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই এই আপ্যায়নের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা এসব আপ্যায়ন গ্রহণ করেন এবং কোনো আপত্তি জানাননি। অথচ তদন্তের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের আপ্যায়ন গ্রহণ করা নৈতিকতা ও সরকারি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

পরদিন ৬ জানুয়ারি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যেসব সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল, তা আদৌ হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো চেয়ারম্যান, সদস্য কিংবা প্রকল্প সভাপতি তদন্ত কর্মকর্তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাননি বলে দাবি করেছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের ডাকার প্রয়োজনই মনে করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিনও তদন্ত কর্মকর্তা পিআইও কার্যালয়েই অধিকাংশ সময় অবস্থান করেন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকেন। মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, কাজের মান যাচাই বা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম শেষ না করেই কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় পিআইও মিশকাতুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনের পিছু নেন। এ সময় তাঁকে বাজারে গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। যদিও তদন্ত কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে নিজের গাড়িতে উঠে এলাকা ত্যাগ করেন।

তবে এই ঘটনা স্থানীয়দের সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে। তাঁদের মতে, তদন্ত কর্মকর্তা যদি নিরপেক্ষ ও আন্তরিক হতেন, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার এমন ঘনিষ্ঠ আচরণ এবং আপ্যায়নের বিষয়টি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন। বরং পুরো ঘটনাপ্রবাহে তদন্ত কর্মকর্তার আচরণ অভিযুক্তদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে নানা অনিয়মের শিকার হয়ে আসছি। আশা ছিল, উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এসে নিরপেক্ষ তদন্ত করবেন। কিন্তু উনি এসে যেভাবে আপ্যায়ন নিলেন এবং কারও সঙ্গে কথা না বলেই চলে গেলেন, তাতে মনে হচ্ছে তদন্তটা আগেই সাজানো ছিল।”

একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নোটিশে লেখা ছিল আমাদের বক্তব্য নেওয়া হবে। কিন্তু কেউ আমাদের ডাকেনি। তদন্ত না করে শুধু অফিসে বসে নাশতা করলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?”

এ ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “এভাবে তদন্ত করলে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তদন্ত মানে শুধু অফিসে বসে থাকা নয়, মাঠে গিয়ে সত্য উদঘাটন করা।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন বলেন, তিনি প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলেও তিনি জানান।

তবে তাঁর এই বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন বা সাক্ষাৎকারের কোনো দৃশ্য কেউ দেখেনি। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন কতটা বাস্তব ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের দায়সারা তদন্ত শুধু অভিযুক্তদেরই রক্ষা করে না, বরং ভবিষ্যতে অনিয়ম আরও উৎসাহিত করে। তাঁদের মতে, যদি অভিযোগ তদন্ত করতে আসা কর্মকর্তারাই অভিযুক্তদের সঙ্গে আপ্যায়নে সময় কাটান, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা কোথায় থাকবে।

এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের পুনঃতদন্ত এবং তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের ব্যবস্থা নেবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠে নয় অফিসে তদন্ত, আপ্যায়নে ব্যস্ত উপপরিচালক সানোয়ার হোসেন

আপডেট সময় ০২:০১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

কমিশন ছাড়া বিলে স্বাক্ষর করানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় এসে দায়িত্বশীল ভূমিকা না পালনের অভিযোগ উঠেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার পরিবর্তে তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে খোশগল্প ও আপ্যায়নে সময় কাটিয়ে কোনো ধরনের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ছাড়াই এলাকা ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

জানা গেছে, বিভিন্ন ঠিকাদার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিশকাতুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কমিশন আদায়, প্রকল্পের বিল ছাড়ে অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবসহ একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছিল। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, তিনি ৫ জানুয়ারি দুপুরে সোনাইমুড়ী উপজেলায় এসে অভিযোগগুলো সরেজমিনে তদন্ত করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করবেন। পরদিন ৬ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, প্রকল্প সভাপতি ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়টি নোটিশে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত পিআইও মিশকাতুর রহমান এবং নোয়াখালী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুদ আলম। তদন্ত কর্মকর্তা কার্যালয়ে প্রবেশের পরপরই আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত কার্যক্রম শুরু না করে দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন বলে অভিযোগ।

সেই সময় পিআইও কার্যালয়ে ফলমূল, বিস্কিট, চানাচুর, বাদাম ও চায়ের বিশেষ আয়োজন করা হয়। স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশ তদন্ত কর্মকর্তার সামনেই এই আপ্যায়নের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা এসব আপ্যায়ন গ্রহণ করেন এবং কোনো আপত্তি জানাননি। অথচ তদন্তের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষের কাছ থেকে কোনো ধরনের আপ্যায়ন গ্রহণ করা নৈতিকতা ও সরকারি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

পরদিন ৬ জানুয়ারি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যেসব সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল, তা আদৌ হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো চেয়ারম্যান, সদস্য কিংবা প্রকল্প সভাপতি তদন্ত কর্মকর্তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাননি বলে দাবি করেছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা নোটিশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের ডাকার প্রয়োজনই মনে করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিনও তদন্ত কর্মকর্তা পিআইও কার্যালয়েই অধিকাংশ সময় অবস্থান করেন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকেন। মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, কাজের মান যাচাই বা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম শেষ না করেই কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় পিআইও মিশকাতুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনের পিছু নেন। এ সময় তাঁকে বাজারে গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। যদিও তদন্ত কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ না করে উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে নিজের গাড়িতে উঠে এলাকা ত্যাগ করেন।

তবে এই ঘটনা স্থানীয়দের সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে। তাঁদের মতে, তদন্ত কর্মকর্তা যদি নিরপেক্ষ ও আন্তরিক হতেন, তাহলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার এমন ঘনিষ্ঠ আচরণ এবং আপ্যায়নের বিষয়টি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন। বরং পুরো ঘটনাপ্রবাহে তদন্ত কর্মকর্তার আচরণ অভিযুক্তদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, “আমরা বহুদিন ধরে নানা অনিয়মের শিকার হয়ে আসছি। আশা ছিল, উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এসে নিরপেক্ষ তদন্ত করবেন। কিন্তু উনি এসে যেভাবে আপ্যায়ন নিলেন এবং কারও সঙ্গে কথা না বলেই চলে গেলেন, তাতে মনে হচ্ছে তদন্তটা আগেই সাজানো ছিল।”

একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নোটিশে লেখা ছিল আমাদের বক্তব্য নেওয়া হবে। কিন্তু কেউ আমাদের ডাকেনি। তদন্ত না করে শুধু অফিসে বসে নাশতা করলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় থাকবে?”

এ ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “এভাবে তদন্ত করলে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তদন্ত মানে শুধু অফিসে বসে থাকা নয়, মাঠে গিয়ে সত্য উদঘাটন করা।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ত্রাণ–১) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন বলেন, তিনি প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলেও তিনি জানান।

তবে তাঁর এই বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন বা সাক্ষাৎকারের কোনো দৃশ্য কেউ দেখেনি। ফলে তদন্ত প্রতিবেদন কতটা বাস্তব ও নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের দায়সারা তদন্ত শুধু অভিযুক্তদেরই রক্ষা করে না, বরং ভবিষ্যতে অনিয়ম আরও উৎসাহিত করে। তাঁদের মতে, যদি অভিযোগ তদন্ত করতে আসা কর্মকর্তারাই অভিযুক্তদের সঙ্গে আপ্যায়নে সময় কাটান, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা কোথায় থাকবে।

এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের পুনঃতদন্ত এবং তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের ব্যবস্থা নেবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।