বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) মানিকগঞ্জ কার্যালয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মাহবুব কামাল—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব ও সরাসরি তদারকির আওতায় পরিচালিত এই কার্যক্রমে প্রকাশ্যেই ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের ‘পাস’ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাঁর নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তায় দালালচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিকগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অধিকাংশ আবেদনকারীকে পরিকল্পিতভাবে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ফেল দেখানো হয়। এরপর দালালদের মাধ্যমে জনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা উৎকোচ দিলে সেই ফেল কেটে ‘পাস’ দেখানো হয়। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই নিয়মিত ও প্রকাশ্য যে, দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলেও সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট বোর্ড থাকলেও এর সার্বিক প্রশাসনিক দায়িত্ব ও তদারকি সহকারী পরিচালকের হাতেই থাকে। পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ, মাঠ ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও বাস্তবে এসবের কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায় না। বরং মাঠে দালালদের অবাধ বিচরণ, পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং পাস-ফেল নির্ধারণের অভিযোগ নিয়মিত শোনা যাচ্ছে।
সরেজমিনে মানিকগঞ্জ কালেক্টরেট স্কুল মাঠে মোটরসাইকেলের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় দেখা যায়, পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যত দালালদের নিয়ন্ত্রণে। কে আগে পরীক্ষা দেবে, কে ফেল করবে, কে টাকা দিয়ে পাস হবে—এসব সিদ্ধান্ত মাঠেই নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষার তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অনেককে সরাসরি নজরদারি করতে দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের ইঙ্গিতেই পাস-ফেল নির্ধারণ করা হয়। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, সহকারী পরিচালক হিসেবে মাহবুব কামাল কোথায় ছিলেন এবং কেন তিনি এই বিশৃঙ্খলা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখেননি।
প্রাইভেট কার চালনার পরীক্ষাতেও অনিয়মের চিত্র ভিন্ন নয়। বিআরটিসির কয়েকজন ইনস্ট্রাকটর ও দালাল পরীক্ষার্থীদের সরাসরি দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা করছেন, যা নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে প্রকৃত পরীক্ষা না হয়ে কার্যত প্রশিক্ষণের আদলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একাধিক পরীক্ষার্থী জানান, গাড়ি চালনায় দক্ষ না হলেও দালালদের সঙ্গে চুক্তি করলে পাস নিশ্চিত। কেউ কেউ বলেন, প্রথমে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল দেখিয়ে পরে টাকা নিয়ে পাস করানো হয়। এসব অনিয়ম সহকারী পরিচালকের অজান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলা অসম্ভব বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, দালালদের মাধ্যমে মোটরসাইকেল ও গাড়ি ভাড়া দিয়েও পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ এসব কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত নির্দেশনা, অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া যায়নি।
দায়িত্বশীল একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বিশেষ করে সহকারী পরিচালক হিসেবে মাহবুব কামালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ তিনি চাইলে নিয়মিত তদারকি, হঠাৎ পরিদর্শন, দালাল শনাক্তকরণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তাঁর দায়িত্ব পালন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
বিআরটিএ মানিকগঞ্জ কার্যালয়ে গত কয়েক সপ্তাহে শত শত পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও উত্তীর্ণের হার ও বাস্তব দক্ষতার মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যারা প্রকৃত অর্থে দক্ষ, তারাও দালাল না ধরায় ফেল করছেন; আবার অদক্ষরা অর্থের বিনিময়ে পাস পাচ্ছেন। এই বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার দায় শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রধানের দিকেই যায় বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনিয়ম শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার ফলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, প্রাণহানি ঘটছে, অথচ এর দায় কেউ নিচ্ছে না। একজন সহকারী পরিচালক যদি নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেই মনে করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক মাহবুব কামালের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অভিযোগ, অসংখ্য ভুক্তভোগীর বক্তব্য ও সরেজমিন চিত্রের পরও তাঁর এই বক্তব্যকে অনেকেই দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। কারণ একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে ‘নির্দিষ্ট অভিযোগ’ অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগে অনিয়ম দমন করার প্রত্যাশা করা হয়।
মানিকগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অনিয়মের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায় সহকারী পরিচালক মাহবুব কামাল এড়াতে পারেন না। তাঁরা অবিলম্বে তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় তদন্ত, সাময়িক প্রত্যাহার এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, একজন কর্মকর্তার অবহেলা বা প্রশ্রয় ছাড়া কোনো দালালচক্র এভাবে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন জিম্মি করে রাখতে পারে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















