জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) আলমগীর হুছাইন-এর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, নিয়ম লঙ্ঘন করে টেন্ডারবিহীন ঠিকাদারি কাজ প্রদান, আর্থিক লেনদেনে অপারগ কর্মকর্তাকে বদলি এবং ক্ষমতার একক কর্তৃত্ব খাটিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একটি শক্তিশালী দালাল চক্রের মাধ্যমে এসব অনিয়ম পরিচালনা করেন এবং অফিস শেষে তাদের নিয়ে নিজের কার্যালয়ে আড্ডার আসর বসান।
দালাল সিন্ডিকেট ও অফিস টাইম শেষে আড্ডা: অভিযোগকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, আলমগীর হুছাইন একটি দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন, যাদের মাধ্যমে নিয়োগ তদবির, প্লট ও ফ্ল্যাটের দায়মুক্তি-সহ বিভিন্ন চুক্তির কাজ সম্পন্ন হয়। এই চক্রে মাইন উদ্দিন, নিলয়, জয়নাল এবং খাইরুল-সহ অনেকেই জড়িত। প্রায় প্রতিদিনই অফিস সময় শেষে অন্যান্য কর্মকর্তারা চলে গেলেও, তিনি ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত নিজস্ব দালালদের নিয়ে নিজের কক্ষে আড্ডা দেন এবং চুক্তিতে বিভিন্ন কাজ সারেন।
অর্থ লেনদেন ও কালেক্টর: অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সংগ্রহ বা ‘কালেক্টর’-এর দায়িত্ব পালনে তিনি অফিস সহায়ক নজরুল এবং ড্রাইভার মো. মাসুদকে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বদলি বাণিজ্য ও অসদাচরণ: সাময়িক অব্যাহতি বা চাকরিচ্যুতির শিকার কর্মচারীদের তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক প্রতিবেদন দিতে তিনি আর্থিক লেনদেন করেন বলে অভিযোগ। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে তিনি অসদাচরণ করেন। ঢাকা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী পরিচালক একরামুল কবীরকে ঘুষ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় মাত্র সাত মাসের মাথায় তাকে সিলেট বদলি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কৌশলে সাবেক প্রশাসক আতিউর রহমানকে সরিয়ে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছেন বলেও গুঞ্জন আছে।
টেন্ডার ও আর্থিক অনিয়ম: প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় নরসিংদীর এক ঠিকাদারকে নিয়ম লঙ্ঘন করে টেন্ডার ছাড়াই স্টেশনারি মালামাল সরবরাহ ও বিশ্ব বসতি দিবসের কাজ দেওয়া হয়।
গৃহায়ন প্রকল্পে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
‘কনকচাঁপা’ প্রকল্পের ২৫৩টি রেডি ফ্ল্যাটের দায়মুক্তি-সহ নানা কাজের অনুমতি দেন আলমগীর হুছাইন। এই প্রকল্পের ফ্ল্যাটপ্রাপ্তদের দায়মুক্তি-সহ বিভিন্ন কাজের জন্য তাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব কাজে চুক্তিভিত্তিক লেনদেন করেন। এছাড়া, মিরপুর-১০ ব্লক বি সংলগ্ন বাণিজ্যিক প্লটে ২১ শতাংশের পরিবর্তে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৬ শতাংশ বিলম্ব ফি আদায় দেখানো হয়। রূপনগর গভ: হাউজিং এস্টেটে সমবায়ের নামে আবেদনের চেয়ে ৪.৮ শতাংশ জমি বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত।
নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও বাণিজ্য
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষে ৯ম থেকে ১১তম গ্রেডের মোট ৭টি ক্যাটাগরির ১৬টি শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ১৬টি নিয়োগের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই তার সুপারিশে বিশেষ সুবিধায় নিয়োগ পেয়েছেন।
কর্মচারী কন্যার নিয়োগ: জাতীয় গৃহায়ণের উচ্চমান সহকারী লতিফা আক্তারের মেয়েকে সহকারী স্থপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের জন্য ‘মিষ্টি খাওয়ার’ নামে প্রায় ৭ লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ আছে।
বৃহত্তর নিয়োগ বাণিজ্য: একইসাথে ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডের ১১টি শূন্য পদে আরও ৬০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এদের ভাইভা চলমান। অভিযোগ উঠেছে, আলমগীর হুছাইন ভাইভা বোর্ডে তার পরিচিতদের বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন এবং এই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে রমরমা বাণিজ্য করেছেন।
বদলি বাণিজ্য: ঢাকার বাইরে বদলি এবং তাদের স্থলে ঢাকায় পোস্টিং পাওয়া কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জাতীয় গৃহায়ণ সচিব মন্দিপ কুমার এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে বলেন, “আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। যদিও অনেক অভিযোগই তার ব্যক্তিগত কাজের সাথে সম্পর্কিত, তবুও গৃহায়ণের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় গৃহায়ণকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এবং এখানে অপরাধ যে-ই করুক, আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।”
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) আলমগীর হুছাইন এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কাল্পনিক বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি নিয়োগের ভাইভা বোর্ডে আছি, এখন সব কথা বলতে পারছি না। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক কথা।”
উচ্চমান সহকারী লতিফা আক্তার তার মেয়ের নিয়োগের বিষয়ে বলেন, “আমার মেয়েকে চাকরিতে যোগদান করিয়েছি, শুধু আমি হেরে যাব বলে। তা না হলে চাকরি করানোর কোনো ইচ্ছে ছিল না।”
জাতীয় গৃহায়ণ চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, “সব নিয়ম মেনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এসব নিয়োগে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। ৯ম থেকে ১১তম গ্রেডে ১৬ জন এবং ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেডে ১১টি শূন্য পদে আরও ৬০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।”
সংবাদ শিরোনাম ::
৭৬ জনের নিয়োগে অনিয়ম, টেন্ডারবিহীন কাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
জাতীয় গৃহায়ণে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দালাল সিন্ডিকেট: প্রশাসকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:১১:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
- ৬২৪ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















