ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নানা আলোচনা চলছে। বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়ন, বদলি, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম আরা বেগমের নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ডিপিডিসির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন।
ডিপিডিসির একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক গ্রুপিং গড়ে উঠেছিল, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সুবিধা পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, শামীম আরা বেগম এই কাঠামোর একটি সক্রিয় অংশ ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব রেখেছেন। তবে এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি।
ডিপিডিসি সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, শামীম আরা বেগমের দায়িত্বকালীন সময়ে কিছু অভ্যন্তরীণ নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। কেউ কেউ দাবি করেন, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা তার প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধাজনক পোস্টিং পেয়েছেন। তবে এসব দাবি এখনো প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা যায়।
বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো—বিশেষ করে ডিপিডিসি ও অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিতে—দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু কর্মকর্তা অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রকল্প দুর্নীতি এবং বিল কারচুপির অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছেন। যেমন ACC একাধিক ডিপিডিসি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আর্থিক অনিয়মের মামলা করেছে বলে প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শামীম আরা বেগমের নাম ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোকে ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন অনেক কর্মচারী। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি “প্রভাবশালী বলয়” কাজ করেছে, যারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং অন্যদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে, ডিপিডিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ নিয়ে অনেকেই নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতিতে পুরোনো অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন করে সামনে আসছে। ফলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে অভিযোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ পরিবেশে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার। কিছু কর্মকর্তা দাবি করেন, গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ সুপারিশ ও ব্যক্তিগত প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, ডিপিডিসিতে প্রকল্প দুর্নীতি, বিল অনিয়ম এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শামীম আরা বেগমের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ, যা কিছু অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে আসে, তা হলো প্রতিষ্ঠানিক সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক পদে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়, কিন্তু সেটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন।
ডিপিডিসির কিছু কর্মচারী মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন করে পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কিছু পুরোনো কর্মকর্তাকে ঘিরে অতীত কর্মকাণ্ড আবার সামনে আনা হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাড়ছে এবং কর্মপরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় সরকারি সংস্থাগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা না থাকলে গোষ্ঠীগত প্রভাব বাড়ে। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা এটিও বলছেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া জনসমক্ষে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনগতভাবে সংবেদনশীল।
ডিপিডিসির বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে। তারা মনে করছেন, যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
শামীম আরা বেগমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো তাই একক কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়, বরং এটি ডিপিডিসির দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
ডিপিডিসির ভেতরের পরিস্থিতি এখন একটি পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি জটিল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কর্মচারীরা আশা করছেন, স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আবারও স্থিতিশীল ও কার্যকর অবস্থায় ফিরে আসবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















