আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সড়ক ও মহাসড়ক খাতে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করা হলেও, একই সময়ে এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও ছিল ব্যাপক আলোচনায়। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়, সড়ক খাতে বিভিন্ন প্রকল্পে ২৯ হাজার ২৩০ কোটি থেকে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। ওই সময়ের ১৫ বছরের মধ্যে ১২ বছর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ওবায়দুল কাদের। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রভাববলয়ে থাকা একাধিক কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রকল্প, টেন্ডার ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব কর্মকর্তার অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে। এমনই একজন কর্মকর্তা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল। তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি নতুন করে একটি লিখিত অভিযোগ গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন সওজের এক ঠিকাদার। অভিযোগপত্রে তাকে “ওবায়দুল কাদেরের বিশেষ স্নেহধন্য” এবং বর্তমানে “নব্য জাতীয়তাবাদী” হিসেবে উল্লেখ করে দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোমারিজপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহেরের ছেলে আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও পদোন্নতি লাভ করেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির শুরুতে তিনি আওয়ামীপন্থী প্রকৌশলী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রীর এলাকায় চকরিয়া সড়ক উপবিভাগে তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন নেন এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। ২০০৬ সালে আবারও তদবিরের মাধ্যমে ঢাকা সড়ক বিভাগের কল্যাণপুর উপবিভাগে যোগদান করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আশুলিয়া টোল আদায়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি দাবি করেন, আওয়ামীপন্থী হওয়ার কারণেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর নিজেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ধীরে ধীরে ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক ইকবাল নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদেরের কাছেও নিয়মিত বিভিন্ন উপহার-উপঢৌকন পৌঁছে দিতেন। একই সঙ্গে নোয়াখালীর প্রভাবশালী সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বরিশাল সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং সর্বশেষ কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব পদায়ন ও পদোন্নতির পেছনে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবই ছিল প্রধান নিয়ামক। একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা অবসরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও পদোন্নতি না পেলেও তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তার কর্মস্থলগুলোতে ঘুষ, টেন্ডার কমিশন বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল নিয়মিত। ই-জিপি চালু হওয়ার পরও তিনি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের প্রভাব ব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন তিনি নিয়মিত অফিসে যাননি। পরে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে নিজেকে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন এবং চট্টগ্রাম সড়ক জোনে পদায়নের চেষ্টা করেছিলেন। তবে একাধিক ঠিকাদার ও বিএনপিপন্থী কর্মকর্তার আপত্তির কারণে সেই পদায়ন কার্যকর হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তার বিপুল সম্পদের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, কমিশন, টেন্ডার বাণিজ্য ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীতে তার একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, দামি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ১/১২ পার্ক ভিউ ভবনের এ/১ নম্বর ফ্ল্যাটটি তার মালিকানাধীন, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিয়ে নিজে গুলশানে বসবাস করেন। এছাড়া রাজধানীতে আরও কয়েকটি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এসব সম্পদের বড় অংশ তার আয়কর নথিতে প্রদর্শিত হয়নি এবং আইনের চোখ ফাঁকি দিতে স্ত্রী ফারজানা রহমান ভূঁইয়া, সন্তান ও বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামি সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে। তার টিআইএন, এনআইডি ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের তথ্য যাচাই করলে প্রকৃত সম্পদের হিসাব বেরিয়ে আসবে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া রাজউকের সাবেক বিতর্কিত চেয়ারম্যান নুরুল হুদার আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মস্থলে তার কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। ২০২৯ সালে অবসরে যাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবালের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো খুদে বার্তার জবাবে তিনি বলেন, “আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 












