ঢাকা ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ ভুয়া ইউডিতে পণ্য খালাস, আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দখলমুক্ত করে বনায়ন করা হয়েছে ৭৫ একর বনভূমি প্রশংসিত হয়েছেন বনবিট কর্মকর্তা ৩ মিনিটে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন মুন্সী কবির উদ্দিন সড়কের ওয়াইডিং ও বিটুমিন কার্পেটিং কাজ পরিদর্শনে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক সরকার ৫ বছরে ১ কোটি মানুষকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চায় : প্রতিমন্ত্রী নুর বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আইপিইউ মহাসচিবের সাক্ষাৎ নবম পে-স্কেলের অনুমোদন দিল মন্ত্রিসভা নিজের অজান্তেই নামাজে যে ৪ ভুল করেন অধিকাংশ মানুষ

আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০৩:১৯:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৫ বার পড়া হয়েছে

সরকারের রাজস্ব আহরণে আইন ও বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বেনাপোল কাস্টমস হাউসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্বল তদারকি, শুল্ক ফাঁকিবাজদের প্রতি নীরব প্রশ্রয় এবং অসাধু কর্মকর্তা-আমদানিকারক-সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের যোগসাজশে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি কমে যাওয়া এবং শুল্ক ফাঁকির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে অসাধু কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমসের অব্যবস্থাপনার কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন কতিপয় অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত সি অ্যান্ড এফ এজেন্টরা।

সম্প্রতি ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি ইমিটেশন জুয়েলারির চালানে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় আমদানিকারককে জরিমানা করা হলেও শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িতরা আরও উৎসাহিত হবে।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, ঢাকার চকবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘টি এল ট্রেডিং’-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি আমদানি করে বেনাপোল বন্দরের ৪২ নম্বর পণ্যাগারে সংরক্ষণ করেন। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ৬০১/২০২৬/০০৩/০০৪৭২৭৯/০৮ এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি। আমদানিকারকের পক্ষে সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট প্রতিনিধি হিসেবে সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক আল আমিন সোহাগ পণ্য খালাসের জন্য কাস্টমসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেন।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষার সময় দেখা যায়, ঘোষণাপত্রে প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করা হয়েছে। এছাড়া ঘোষণাকৃত ওজনের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি উচ্চ শুল্কমূল্যের অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, “কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ন্যায় নির্ণয় করে জরিমানা করা হয়েছে।” তবে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব তিনি দেননি।
এ ঘটনায় আরও অভিযোগ উঠেছে, বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহায়তায় মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগ অতীতেও একই কৌশলে নামমাত্র শুল্ক দিয়ে উচ্চ শুল্কমূল্যের একাধিক চালান ছাড় করিয়েছেন।
অন্যদিকে বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর বিরুদ্ধে ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জি এন এক্সপোর্টার্সের রপ্তানিকৃত ‘ইনসুলেটিং ভার্নিশ ফর কপার’ (এসএস কোড-৩২০৮১০২০) পণ্যের ২০টির বেশি চালানে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বি/ই নম্বর ৮৯৯৬২, ৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫, ৮৭৭০১, ৮৯৯৮২ ও ৮৫৩৬সহ একাধিক চালানে প্রকৃত মূল্য উপেক্ষা করে প্রতি ইউনিট মাত্র ১ দশমিক ২০ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাস দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আমদানিকারকদের দাবি, এতে তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গত ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকির একাধিক ঘটনা ধরা পড়েছে। গত ৯ মার্চ ২০২৬ বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগারে রাখা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজের মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত ১৭ টন পাটবীজ জব্দ করা হয়। এ চালানের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল কদর অ্যান্ড কোং।

জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১২ মার্চ ২০২৬ রাতে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে অভিযান চালিয়ে বেকিং পাউডার ঘোষণায় আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস ও কেমিক্যাল আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ছিল ৬০১/২০২৬/০০১/০০১৬৩৩৩/০৩। আমদানিকারক ছিল সাফা ইমপেক্স এবং সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
গত ১৫ জুন ২০২৬ বন্দরের ২৬ নম্বর পণ্যাগার থেকে টি এস ইন্টারন্যাশনালের মিথ্যা ঘোষণায় আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম আটক করা হয়।
এছাড়া বন্দরের ৩৪ নম্বর কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজ শিল্পকারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে (বি-এল নম্বর ১৯০৪২) বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রা আমদানি করলে চালানটি জব্দ করা হয়। এ চালানের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের নীরব সম্মতি ছাড়া এসব চালান বন্দরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ী মহলের দাবি, বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অসাধু কর্মকর্তারা আমদানিকারকদের অবৈধ সুবিধা দিয়ে পণ্য খালাসে সহযোগিতা করেন, যা বর্তমানে বেনাপোলে অনেকটা ওপেন সিক্রেট।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ঘুষসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার এবং তার সহযোগী এনজিও কর্মী হাসিবুর রহমানকে আটক করে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়ার নামে জব্দ করা ভারতীয় উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য কাস্টমস গুদাম থেকে পাচারের সময় ২২ জুন ২০২৬ দিবাগত রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আটক করে। পরে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিআইডির তদন্তে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বনাথ কুন্ড, গুদাম ইনচার্জ আরশাদ হোসেন, ভল্ট ইনচার্জ শাহিবুল সর্দ্দারসহ বেনাপোল কাস্টমসের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
বেনাপোল কাস্টমস হাউস ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই রাজস্ব ঘাটতির পেছনে কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং শুল্ক ফাঁকির ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ তারেক ইকবালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ

আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:১৯:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারের রাজস্ব আহরণে আইন ও বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বেনাপোল কাস্টমস হাউসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্বল তদারকি, শুল্ক ফাঁকিবাজদের প্রতি নীরব প্রশ্রয় এবং অসাধু কর্মকর্তা-আমদানিকারক-সি অ্যান্ড এফ এজেন্টদের যোগসাজশে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি কমে যাওয়া এবং শুল্ক ফাঁকির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে অসাধু কর্মকর্তাদের নীরব সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমসের অব্যবস্থাপনার কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন কতিপয় অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও তাদের মনোনীত সি অ্যান্ড এফ এজেন্টরা।

সম্প্রতি ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি ইমিটেশন জুয়েলারির চালানে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় আমদানিকারককে জরিমানা করা হলেও শুল্ক ফাঁকিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িতরা আরও উৎসাহিত হবে।
বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, ঢাকার চকবাজারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘টি এল ট্রেডিং’-এর মালিক মোস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে ৬৮৭ প্যাকেজ ইমিটেশন জুয়েলারি আমদানি করে বেনাপোল বন্দরের ৪২ নম্বর পণ্যাগারে সংরক্ষণ করেন। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ৬০১/২০২৬/০০৩/০০৪৭২৭৯/০৮ এবং নিট ওজন ১৬ হাজার ৮৫৪ কেজি। আমদানিকারকের পক্ষে সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট প্রতিনিধি হিসেবে সোহাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ও ওরিয়েন্টাল ট্রেডিং সেন্টারের মালিক আল আমিন সোহাগ পণ্য খালাসের জন্য কাস্টমসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেন।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি পরীক্ষার সময় দেখা যায়, ঘোষণাপত্রে প্রকৃত আমদানি মূল্য গোপন করা হয়েছে। এছাড়া ঘোষণাকৃত ওজনের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৪০ কেজি উচ্চ শুল্কমূল্যের অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, “কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ন্যায় নির্ণয় করে জরিমানা করা হয়েছে।” তবে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব তিনি দেননি।
এ ঘটনায় আরও অভিযোগ উঠেছে, বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের সহায়তায় মাত্র ৫১ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ঘোষণা দিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকার পণ্য খালাসের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট আল আমিন সোহাগ অতীতেও একই কৌশলে নামমাত্র শুল্ক দিয়ে উচ্চ শুল্কমূল্যের একাধিক চালান ছাড় করিয়েছেন।
অন্যদিকে বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী ও রাজস্ব কর্মকর্তা সনজুর বিরুদ্ধে ভারতীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জি এন এক্সপোর্টার্সের রপ্তানিকৃত ‘ইনসুলেটিং ভার্নিশ ফর কপার’ (এসএস কোড-৩২০৮১০২০) পণ্যের ২০টির বেশি চালানে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বি/ই নম্বর ৮৯৯৬২, ৮৬৯৭৮, ৮৫৩৬৫, ৮৭৭০১, ৮৯৯৮২ ও ৮৫৩৬সহ একাধিক চালানে প্রকৃত মূল্য উপেক্ষা করে প্রতি ইউনিট মাত্র ১ দশমিক ২০ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাস দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আমদানিকারকদের দাবি, এতে তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গত ছয় মাসে বেনাপোল কাস্টমসে শুল্ক ফাঁকির একাধিক ঘটনা ধরা পড়েছে। গত ৯ মার্চ ২০২৬ বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগারে রাখা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজের মিথ্যা ঘোষণায় আমদানিকৃত ১৭ টন পাটবীজ জব্দ করা হয়। এ চালানের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল কদর অ্যান্ড কোং।

জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১২ মার্চ ২০২৬ রাতে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে অভিযান চালিয়ে বেকিং পাউডার ঘোষণায় আমদানিকৃত উচ্চমূল্যের শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস ও কেমিক্যাল আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চালানটির মেনিফেস্ট নম্বর ছিল ৬০১/২০২৬/০০১/০০১৬৩৩৩/০৩। আমদানিকারক ছিল সাফা ইমপেক্স এবং সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল মেসার্স হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
গত ১৫ জুন ২০২৬ বন্দরের ২৬ নম্বর পণ্যাগার থেকে টি এস ইন্টারন্যাশনালের মিথ্যা ঘোষণায় আনা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের শাড়ি ও ফেসওয়াশ ক্রিম আটক করা হয়।
এছাড়া বন্দরের ৩৪ নম্বর কেমিক্যাল পণ্যাগারে রাখা ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজ শিল্পকারখানার কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে (বি-এল নম্বর ১৯০৪২) বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রা আমদানি করলে চালানটি জব্দ করা হয়। এ চালানের সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট ছিল হায়দার অ্যান্ড সন্স।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের নীরব সম্মতি ছাড়া এসব চালান বন্দরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ী মহলের দাবি, বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অসাধু কর্মকর্তারা আমদানিকারকদের অবৈধ সুবিধা দিয়ে পণ্য খালাসে সহযোগিতা করেন, যা বর্তমানে বেনাপোলে অনেকটা ওপেন সিক্রেট।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ঘুষসহ রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তার এবং তার সহযোগী এনজিও কর্মী হাসিবুর রহমানকে আটক করে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দেওয়ার নামে জব্দ করা ভারতীয় উচ্চ শুল্কমূল্যের পণ্য কাস্টমস গুদাম থেকে পাচারের সময় ২২ জুন ২০২৬ দিবাগত রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আটক করে। পরে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।

এর আগে ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর রাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সুরক্ষিত ভল্ট ভেঙে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে ১৯ কেজি ৩৩৮ গ্রাম সোনা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিআইডির তদন্তে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বনাথ কুন্ড, গুদাম ইনচার্জ আরশাদ হোসেন, ভল্ট ইনচার্জ শাহিবুল সর্দ্দারসহ বেনাপোল কাস্টমসের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
বেনাপোল কাস্টমস হাউস ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর নির্ধারিত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব আদায়ে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই রাজস্ব ঘাটতির পেছনে কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং শুল্ক ফাঁকির ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।