ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান যখন দেশজুড়ে নানা প্রশ্নের মুখে, ঠিক তখনই হাসপাতালটির শীর্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক মো. জালাল আহমেদ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লার্ক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার ও চাকরি বাণিজ্য, এবং জাল স্বাক্ষরে সরকারি তহবিল লোপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন রাহিমা আক্তার মুক্তা নামের এক নারী।
অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি অর্থবছরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ‘৩২৩১৩০১’ অর্থনৈতিক কোডের অধীনে যে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেই টাকা কোনো প্রকৃত প্রশিক্ষণ ছাড়াই সম্পূর্ণ গ্রাস করছে এই চক্র। ডা. আশরাফুল আলমের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ও তার সিন্ডিকেট ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম ব্যবহার করে দৈনিক ভাতার টাকা তুলে নিয়েছেন।
প্রধান সহকারী ও ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে রেজিস্টারে জাল স্বাক্ষর বসিয়ে এবং প্রশিক্ষণ ভাতা গ্রহণের মূল রেজিস্টার ও বিল ভাউচারগুলোতে মাত্র চারজন মিলে সবার স্বাক্ষর নকল করে সরকারি অর্থ লোপাট করা হচ্ছে, যেখানে ডা. আশরাফুল আলম নিজেই ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতি এখানেই শেষ নয়; হাসপাতালটির যাবতীয় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নতুন চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং নিয়মবহির্ভূত বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এই অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে ডা. আশরাফুল আলম ঢাকা শহরের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় নামে বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা রেখেছেন, যার মধ্যে লক্ষ্মীবাজারের রসের গলি এলাকায় একটি বাড়ি কেনার সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।
একইভাবে অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক মো. জালাল আহমেদ ও তার স্ত্রী শাহিন সুলতানার নামেও অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় বহুতল ভবনসহ একাধিক ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় কোটি টাকা।
এছাড়াও মো. জালাল আহমেদের নিজ এলাকা ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার কে ডি হাট গ্রামেও বিপুল পরিমাণ বেনামী সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে দুদকে জমা দেয়া অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়।
এতসব দুর্নীতি করেও ডা. আশরাফুল আলম গং পার পেয়ে যাচ্ছেন ভোল পাল্টানো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে। এমনকি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে দুদকসহ অন্যান্য দপ্তরের অভিযোগ সমূহ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দুদকে জমা দেয়া অভিযোগে বলা হয় , বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডা. আশরাফুল আলম নিজেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এবং আওয়ামীপন্থী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ডান হাত হিসেবে পরিচয় দিতেন। অথচ বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডা. আশরাফুল আলম নিজেকে রাতারাতি বিএনপি পন্থী চিকিৎসক নেতা ও সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিজের সব অপরাধ-অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক প্রশাসন ডাক্তার আশরাফুল আলমের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তায় অভিযুক্ত ডাক্তার আশরাফুল আলম বলেন” দুঃখিত, এসব অযথা বানানো বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি পরিচালক মহোদয়ের সাথে কথা বলুন। ভালো থাকবেন।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লার্ক মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের মুঠোফোনে কল করলে তিনি জানান যে, তিনি এসব অনিয়মের সাথে জড়িত নন।
অভিযুক্ত আরেক ব্যক্তি হাসপাতালের অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক মোঃ জালাল আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া প্রদান করেননি।
অভিযোগ পত্রে আরো উল্লেখ করা হয় এই দুর্নীতিবাজ ত্রয়ীর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে এই বিষয়ে দুদক থেকে একজন উপসহকারী পরিদর্শককে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত রহস্যজনক কারণে কোনো দৃশ্যমান ফলাফল প্রকাশ পায়নি, যার সুযোগ নিয়ে আবারো লোক দেখানো প্রশিক্ষণের তোড়জোড় শুরু করেছে এই চক্র।
দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসালয়ের এই হরিলুট বন্ধে এবং সরকারি কোষাগারের অর্থ আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী ওই নারী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















