ঢাকা ০৭:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনী-সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষে নিহত ৩০ রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় পতন চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে: রেল প্রতিমন্ত্রী আনোয়ারা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ব্রুনাই শ্রমবাজারে স্থবিরতা, অভিযোগের কেন্দ্রে হাইকমিশনার নওরিন আহসান ক্যাঙ্গারু পারভেজ এর বোনজামাই মাসুমের থাবা: নাসিকের ৮০ টেন্ডারেই ‘ফেইথ অ্যান্ড ফেয়ার’! ঢাকাস্থ কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম এর সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী বরুড়ার সালাহ উদ্দিন জসিম বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ওয়্যারহাউস সুপার রনি ও এআরও মাইদুল সিন্ডিকেটে ৪৭৩১ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি জাতীয়তাবাদী আদর্শের কারনে আওয়ামী আমলে বঞ্চিত আব্দুলাহ্ আরেফ এখনও বঞ্চিত

ব্রুনাই শ্রমবাজারে স্থবিরতা, অভিযোগের কেন্দ্রে হাইকমিশনার নওরিন আহসান

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ব্রুনাইয়ে কর্মী নিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার নেপথ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, ফাইল আটকে রাখা এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নওরিন আহসান। প্রবাসী বাংলাদেশি, কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দূতাবাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ব্রুনাইয়ের মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাইকমিশনের কিছু কর্মকর্তা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছেন। সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা বৈধ রিক্রুটিং কোম্পানিগুলোর আবেদন বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হচ্ছে। এতে সময়মতো চাহিদাপত্র অনুমোদন না পাওয়ায় বহু নিয়োগ অন্য দেশের শ্রমিকদের কাছে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এ অভিযোগের পক্ষে একাধিক নথির তথ্য তুলে ধরেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রুনাইয়ের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান UNITY LAND SDN BHD গত ১ মে ২০২৬ তারিখে ২৩০ জন কর্মী নিয়োগের জন্য কোম্পানির পরিচালক CHANG CHAI WOON ও নির্বাহী পরিচালক LEE SENG POH, JOHN-এর স্বাক্ষরযুক্ত ডিমান্ড লেটার বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠায়। অভিযোগ উঠেছে, ওই আবেদনটি হাইকমিশনার নওরিন আহসান নানান অজুহাতে অনুমোদন না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে পুনরায় আবেদন করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক নিশ্চিত করেন যে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি থার্ড পার্টি দিয়ে করানো হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এরপর একই কোম্পানির চাহিদাপত্র Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে পুনরায় জমা দেওয়া হয়। এ পর্যায়ে শ্রমিকের সংখ্যা ২৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দ্বিতীয় আবেদনটি অল্প সময়ের মধ্যেই অনুমোদন পায় এবং ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে হাইকমিশনারের প্রত্যয়ন শেষে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর ওয়েবসাইটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোয়েসেলের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে আসা এই নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হাইকমিশনার নওরিন আহসান নিয়মিত তাগিদ ও চাপ দিয়ে আসছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের ঘটনাই ব্রুনাই শ্রমবাজারে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাইকমিশনার নওরিন আহসান বা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রিক্রুটিং কোম্পানির স্বত্বাধিকারীর অভিযোগ, প্রতিজন শ্রমিকের বিপরীতে ২০০ থেকে ৩০০ ব্রুনাই ডলার পরিশোধ না করলে চাহিদাপত্রে হাইকমিশনারের স্বাক্ষর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানো প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হয় বা কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ফেলে রাখা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। একই সূত্র আরও অভিযোগ করে, সম্প্রতি দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট বুকিংয়ের বিষয়েও হাইকমিশনারের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ব্রুনাই বিএনপির কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ’ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২৪ জুন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা থেকে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়ে নওরিন আহসান বর্তমান দায়িত্বে যোগ দেন। তাদের দাবি, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনিক গাফিলতি, ধীরগতি ও জবাবদিহির অভাবে প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা গ্রহণেও দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কর্মী নিয়োগসহ নানা প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রুনাইয়ে গেছেন ৭৭ হাজার ৯৫৮ জন বাংলাদেশি কর্মী। কিন্তু কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে এই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। যেখানে আগে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ব্রুনাইয়ে যেতেন, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পাঠানো হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৫৯৭ জন কর্মী, যা অতীতের তুলনায় সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্রগুলোর একটি।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল সম্প্রতি জি-টু-জি ব্যবস্থায় পুনরায় ব্রুনাইয়ে দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। নির্মাণ, রেস্তোরাঁ, কাঠমিস্ত্রি, পেইন্টার, শেফ, ওয়েটারসহ বিভিন্ন খাতে জনবল নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দূতাবাস পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ উদ্যোগও প্রত্যাশিত সাফল্য পাবে না।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্রুনাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি শ্রমবাজার নয়, বরং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ও তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখো কর্মী বিদেশে গিয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সম্ভাবনাময় কোনো শ্রমবাজার প্রশাসনিক অনিয়ম, অস্বচ্ছতা বা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সংকুচিত হলে তার প্রভাব শুধু কয়েকটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়; জাতীয় অর্থনীতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ওপরও পড়তে পারে বলে তারা মনে করেন।

“অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই ও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাইকমিশনার নওরিন আহসান এবং ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।”

প্রবাসীদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের হারানো আস্থা ও অবস্থান পুনরুদ্ধার করা হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনী-সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষে নিহত ৩০

ব্রুনাই শ্রমবাজারে স্থবিরতা, অভিযোগের কেন্দ্রে হাইকমিশনার নওরিন আহসান

আপডেট সময় ০৫:৫২:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ব্রুনাইয়ে কর্মী নিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতার নেপথ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, ফাইল আটকে রাখা এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নওরিন আহসান। প্রবাসী বাংলাদেশি, কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দূতাবাসের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ব্রুনাইয়ের মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাইকমিশনের কিছু কর্মকর্তা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছেন। সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা বৈধ রিক্রুটিং কোম্পানিগুলোর আবেদন বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হচ্ছে। এতে সময়মতো চাহিদাপত্র অনুমোদন না পাওয়ায় বহু নিয়োগ অন্য দেশের শ্রমিকদের কাছে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সম্ভাব্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এ অভিযোগের পক্ষে একাধিক নথির তথ্য তুলে ধরেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রুনাইয়ের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান UNITY LAND SDN BHD গত ১ মে ২০২৬ তারিখে ২৩০ জন কর্মী নিয়োগের জন্য কোম্পানির পরিচালক CHANG CHAI WOON ও নির্বাহী পরিচালক LEE SENG POH, JOHN-এর স্বাক্ষরযুক্ত ডিমান্ড লেটার বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠায়। অভিযোগ উঠেছে, ওই আবেদনটি হাইকমিশনার নওরিন আহসান নানান অজুহাতে অনুমোদন না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে পুনরায় আবেদন করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক নিশ্চিত করেন যে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি থার্ড পার্টি দিয়ে করানো হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এরপর একই কোম্পানির চাহিদাপত্র Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে পুনরায় জমা দেওয়া হয়। এ পর্যায়ে শ্রমিকের সংখ্যা ২৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দ্বিতীয় আবেদনটি অল্প সময়ের মধ্যেই অনুমোদন পায় এবং ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে হাইকমিশনারের প্রত্যয়ন শেষে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর ওয়েবসাইটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোয়েসেলের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, Mariah Munawwarah Employment Agency-এর মাধ্যমে আসা এই নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হাইকমিশনার নওরিন আহসান নিয়মিত তাগিদ ও চাপ দিয়ে আসছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের ঘটনাই ব্রুনাই শ্রমবাজারে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাইকমিশনার নওরিন আহসান বা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি রিক্রুটিং কোম্পানির স্বত্বাধিকারীর অভিযোগ, প্রতিজন শ্রমিকের বিপরীতে ২০০ থেকে ৩০০ ব্রুনাই ডলার পরিশোধ না করলে চাহিদাপত্রে হাইকমিশনারের স্বাক্ষর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানো প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখা হয় বা কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ফেলে রাখা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। একই সূত্র আরও অভিযোগ করে, সম্প্রতি দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট বুকিংয়ের বিষয়েও হাইকমিশনারের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ব্রুনাই বিএনপির কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ’ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ২৪ জুন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা থেকে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়ে নওরিন আহসান বর্তমান দায়িত্বে যোগ দেন। তাদের দাবি, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনিক গাফিলতি, ধীরগতি ও জবাবদিহির অভাবে প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা গ্রহণেও দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কর্মী নিয়োগসহ নানা প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রুনাইয়ে গেছেন ৭৭ হাজার ৯৫৮ জন বাংলাদেশি কর্মী। কিন্তু কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে এই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। যেখানে আগে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ব্রুনাইয়ে যেতেন, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পাঠানো হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৫৯৭ জন কর্মী, যা অতীতের তুলনায় সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্রগুলোর একটি।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল সম্প্রতি জি-টু-জি ব্যবস্থায় পুনরায় ব্রুনাইয়ে দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। নির্মাণ, রেস্তোরাঁ, কাঠমিস্ত্রি, পেইন্টার, শেফ, ওয়েটারসহ বিভিন্ন খাতে জনবল নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দূতাবাস পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ উদ্যোগও প্রত্যাশিত সাফল্য পাবে না।

শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্রুনাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি শ্রমবাজার নয়, বরং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ও তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখো কর্মী বিদেশে গিয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সম্ভাবনাময় কোনো শ্রমবাজার প্রশাসনিক অনিয়ম, অস্বচ্ছতা বা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সংকুচিত হলে তার প্রভাব শুধু কয়েকটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়; জাতীয় অর্থনীতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ওপরও পড়তে পারে বলে তারা মনে করেন।

“অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই ও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাইকমিশনার নওরিন আহসান এবং ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।”

প্রবাসীদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ব্রুনাইয়ের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের হারানো আস্থা ও অবস্থান পুনরুদ্ধার করা হবে।