নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের ৮০টি উন্নয়নকাজের সবকটিতেই দরপত্র (টেন্ডার) জমা দিয়েছে বিগত সরকারের আমলের যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজ ওরফে ‘ক্যাঙ্গারু পারভেজ’-এর বোনজামাতা মাসুমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধানে ও সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ক্যাঙ্গারু পারভেজের বোন প্রমিজের স্বামী মাসুমের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ফেইথ অ্যান্ড ফেয়ার’ (Faith & Fair) এই সবগুলো দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। ৮০টি টেন্ডারের সবকটি কাজে একটি প্রতিষ্ঠানের এমন একচেটিয়া অংশগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ও সাধারণ ঠিকাদারদের মাঝে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও অপরাধ অঙ্গনে এক সময়ের আলোচিত নাম ছিল জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনিদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে এই যুবলীগ ক্যাডারের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই বছরের ২৮ এপ্রিল চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রসহ হামলার ঘটনায় সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে কেন্দ্রীয় যুবলীগ তাকে পদ থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ফেরার পথে গুলশান এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ১০-১২ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এরপর দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও স্থানীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পারভেজ গুমের রহস্য এখনো রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাঙ্গারু পারভেজ গুম হওয়ার পর বিগত সরকারের আমলে তার ভগ্নিপতি মাসুমের মালিকানাধীন ‘ফেইথ অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্মাণ কোম্পানিটি স্থানীয় ঠিকাদারি অঙ্গনে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করে। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেলেও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনের মেগা অবকাঠামো উন্নয়নের ৮০টি টেন্ডারের সবকটিতেই এই প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহন করেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, বিগত সরকারের আমলের একজন চিহ্নিত ক্যাডারের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের এমন একচেটিয়া অংশগ্রহণ এবং সবকটি টেন্ডারে আবেদন করার বিষয়টিকে ঘিরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বিএনপি নেতারা বলছেন, “বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা নানা কায়দায় ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেই ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা বর্তমান মুক্ত পরিবেশেও সমানভাবে অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখছে। তারা একাই ৮০টি টেন্ডারের সবগুলোতে অংশ নেওয়ার মতো সুযোগ পাচ্ছে কীভাবে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
নেতাকর্মীদের দাবি, উন্মুক্ত লটারি পদ্ধতিতে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ নিশ্চিত করতে এই সিন্ডিকেট নিজেদের ‘ফেইথ অ্যান্ড ফেয়ার’ লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ডামি লাইসেন্স ব্যবহার করে পুরো প্রক্রিয়াকে জিম্মি করার পাঁয়তারা করতে পারে। এর ফলে লটারির টেবিলে সাধারণ ও নতুন ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
নেতাকর্মীরা স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁরা কোনো নিয়মের ব্যত্যয় চান না। তবে মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের গুণগত মান এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রশাসন যাতে এই দরপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি রাখে, সেই দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মাসুম এর সাথে যোগাযোগ করার জন্য একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। তার হোয়াটস অ্যাপ নাম্বারে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে তারও কোনো রিপ্লে দেন নি তিনি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















