সংবাদ শিরোনাম ::
কসবায় ইটবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে নিহত ২, আহত ৫ বীরপুশিয়া শহীদ একাডেমিক স্কুলে বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ তিন ধাপে দেশের অর্থনীতিকে সাজাতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জে ব্র্যাকের ১৪ হাজার গাছের চারা বিতরণ ওয়াসার পানি শোধন প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ, বন্ধ দুর্নীতির তদন্ত জাল সনদে ১২ বছর চাকরি, বৈধ সনদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বগুড়া পাসপোর্ট অফিসে ডিডি মানিক ও এডি আজিজের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রূপগঞ্জে ১% বরাদ্দের কোটি টাকা ‘লুটপাট’: ইউএনও ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ বিআরটিসির গাবতলী ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলীর বিরুদ্ধে রাজস্বে ৮ কোটি টাকার ক্ষতির দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কুমিল্লার নতুন ডিসি

বিআরটিসির গাবতলী ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলীর বিরুদ্ধে রাজস্বে ৮ কোটি টাকার ক্ষতির দুর্নীতির অভিযোগ

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বিভিন্ন ডিপোতে সীমাহীন দুর্নীতি, রাজস্ব আত্মসাৎ ও অনিয়মের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান গাবতলী বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইউনিট প্রধান এবং ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) নায়েব আলীর বিরুদ্ধে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেশিরভাগ অপকর্ম ধামাচাপা দিলেও, যে কয়েকটি ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয়েছিল, সেগুলোতেও নামমাত্র শাস্তি বা পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে শাস্তি মুকুব করিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। বিআরটিসি-কে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ উদ্ধারে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল দুর্নীতির পুনঃতদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।

২০১৬ সালে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন নায়েব আলীর বিরুদ্ধে বাসের মেরামত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালের ৮ মে তৎকালীন মন্ত্রী উক্ত ডিপো আকস্মিক পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনে ডিপোর ৫৭৩৯, ৫৭৪১ এবং ৫৩৮১ নম্বর বাসগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং চলাচলের অনুপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়। ফলশ্রুতিতে কর্পোরেশনের আদেশ নং-৩৫.০৪.০০০০.০১১.০০.৪৬৬.৮৮৭ মোতাবেক নায়েব আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি উক্ত বরখাস্তের আদেশ বাতিল করিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরে আসেন।

নায়েব আলীর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের ঘটনাটি ঘটে মতিঝিল বাস ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন) থাকাকালীন (২৭ মার্চ ২০১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২০১৯)। এ সময় LoC-2 ঋণের আওতায় ভারত থেকে আমদানিকৃত নতুন ৩৫টি বাস সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম ভাড়ায় পরিচালনা করেন তিনি। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৭,৫৪,০৮৭ টাকা হারে কর্পোরেশনের সর্বমোট ৮,২০,৬২,৬৮৩ (আট কোটি বিশ লাখ বাষট্টি হাজার ছশো তিরাশি) টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়।

কর্পোরেশনের অডিট বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নায়েব আলীর প্রত্যক্ষ দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরাসরি ১,৭৭,৪১,৮০৭ (এক কোটি ৭৭ লাখ) টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়, যা সরাসরি দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও অদক্ষতার শামিল। এই অপরাধে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (পত্র নং-১৭৮৫) করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামকে ম্যানেজ করে এবং ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রথমে প্রাপ্ত ‘২ বছরের বেতন বর্ধন স্থগিত’ দণ্ডটি (আদেশ নং-২৪২২) কমিয়ে মাত্র ১ বছরে নিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক তদন্তযোগ্য অপরাধ।

খুলনা বাস ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন) থাকাকালীনও দুর্নীতির ধারা বজায় রাখেন নায়েব আলী। ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কর্পোরেশনের পত্র নং-২১০৯ মোতাবেক ভুল তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ৪,৮৭,১৯০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় (আত্মসাৎ) করার জন্য তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন তিনি।

বিআরটিসি’র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন মহলের দাবি, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নায়েব আলীর মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পার পেয়ে গেছেন এবং বর্তমানেও বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রীয় ও জনগণের অর্থের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং বিআরটিসি-কে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে আনীত বিগত সকল দুর্নীতির ফাইল পুনরায় ওপেন করে একটি সুষ্ঠু পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কসবায় ইটবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে নিহত ২, আহত ৫

বিআরটিসির গাবতলী ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলীর বিরুদ্ধে রাজস্বে ৮ কোটি টাকার ক্ষতির দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:২৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বিভিন্ন ডিপোতে সীমাহীন দুর্নীতি, রাজস্ব আত্মসাৎ ও অনিয়মের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান গাবতলী বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইউনিট প্রধান এবং ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) নায়েব আলীর বিরুদ্ধে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেশিরভাগ অপকর্ম ধামাচাপা দিলেও, যে কয়েকটি ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয়েছিল, সেগুলোতেও নামমাত্র শাস্তি বা পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে শাস্তি মুকুব করিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। বিআরটিসি-কে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ উদ্ধারে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল দুর্নীতির পুনঃতদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।

২০১৬ সালে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন নায়েব আলীর বিরুদ্ধে বাসের মেরামত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালের ৮ মে তৎকালীন মন্ত্রী উক্ত ডিপো আকস্মিক পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনে ডিপোর ৫৭৩৯, ৫৭৪১ এবং ৫৩৮১ নম্বর বাসগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের এবং চলাচলের অনুপযোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়। ফলশ্রুতিতে কর্পোরেশনের আদেশ নং-৩৫.০৪.০০০০.০১১.০০.৪৬৬.৮৮৭ মোতাবেক নায়েব আলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি উক্ত বরখাস্তের আদেশ বাতিল করিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরে আসেন।

নায়েব আলীর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের ঘটনাটি ঘটে মতিঝিল বাস ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন) থাকাকালীন (২৭ মার্চ ২০১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২০১৯)। এ সময় LoC-2 ঋণের আওতায় ভারত থেকে আমদানিকৃত নতুন ৩৫টি বাস সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম ভাড়ায় পরিচালনা করেন তিনি। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনহীন এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিদিন গড়ে ৭,৫৪,০৮৭ টাকা হারে কর্পোরেশনের সর্বমোট ৮,২০,৬২,৬৮৩ (আট কোটি বিশ লাখ বাষট্টি হাজার ছশো তিরাশি) টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়।

কর্পোরেশনের অডিট বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নায়েব আলীর প্রত্যক্ষ দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরাসরি ১,৭৭,৪১,৮০৭ (এক কোটি ৭৭ লাখ) টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়, যা সরাসরি দুর্নীতি, আত্মসাৎ ও অদক্ষতার শামিল। এই অপরাধে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (পত্র নং-১৭৮৫) করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামকে ম্যানেজ করে এবং ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রথমে প্রাপ্ত ‘২ বছরের বেতন বর্ধন স্থগিত’ দণ্ডটি (আদেশ নং-২৪২২) কমিয়ে মাত্র ১ বছরে নিয়ে আসেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক তদন্তযোগ্য অপরাধ।

খুলনা বাস ডিপোর ম্যানেজার (অপারেশন) থাকাকালীনও দুর্নীতির ধারা বজায় রাখেন নায়েব আলী। ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কর্পোরেশনের পত্র নং-২১০৯ মোতাবেক ভুল তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ৪,৮৭,১৯০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় (আত্মসাৎ) করার জন্য তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন তিনি।

বিআরটিসি’র সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন মহলের দাবি, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নায়েব আলীর মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পার পেয়ে গেছেন এবং বর্তমানেও বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রীয় ও জনগণের অর্থের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং বিআরটিসি-কে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে আনীত বিগত সকল দুর্নীতির ফাইল পুনরায় ওপেন করে একটি সুষ্ঠু পুনঃতদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।