ঢাকা ০২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ম্যানেজ মাস্টার নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের দুর্নীতি আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের বিতর্কিত কাণ্ডে লাল কার্ডের নিয়মে পরিবর্তন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সাঁটলিপিকার কামাল হোসেনের টাকার পাহাড় ৬ বলে ৬ উইকেট, জোড়া হ্যাটট্রিকের নজির বাগেরহাটে মৎস্য আড়ত নির্মাণে ‘পুকুরচুরি’র অভিযোগ এক বছরে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি কমেছে ৩২ শতাংশ নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাৎ: তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলল অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পাউবোর কাজে অনিয়ম দেখে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলেন এমপি জালাল উদ্দীন বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি ম্যাচ নির্দিষ্ট সময়ে খেলা মাঠে গড়ানো নিয়ে শঙ্কা রূপগঞ্জে স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় সন্তানকে দিয়ে শেখ হাসিনাসহ ৩১০ জনের বিরুদ্ধে ‘জুলাই মামলা’

স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহ এবং দেনা-পাওনার বিরোধ গড়িয়েছে জুলাই আন্দোলনের মামলায়। এস এম ইফতেখার উদ্দিন নাদিম নামের ১৬ বছরের এক কিশোর বাদী হয়ে এ মামলা করে। এতে আসামি করা হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১০ জনকে। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। জানা গেছে, বাবার পাওনাদার এবং মায়ের আত্মীয়দের ফাঁসাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতের নাটক সাজিয়ে এই মামলা করা হয়েছিল।

গত বছরের ৬ আগস্ট এস এম ইফতেখার উদ্দিন নাদিম নামের এক কিশোর আদালতে মামলাটি দায়ের করে। এতে সে নিজেকে জুলাই আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ও আহত হিসেবে দাবি করে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়।

নাদিম তার এজাহারে দাবি করে, ১৯ জুলাই কদমতলী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে থাকা অবস্থায় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ছোড়া একটি গুলি তার মাথায় লাগে। এরপর তাকে মারধর করে অচেতন অবস্থায় কদমতলী থানায় সোপর্দ করা হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সে মুক্তি পায়। পরে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। এতে বলা হয়, নাদিমের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।

পিবিআই উল্লেখ করেছে, ‘বাদীর আরজিতে বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে বিবাদীদের জড়িত থাকার পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাদী ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে আহত হয়েছে, এমন কোনো দালিলিক নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং যাত্রাবাড়ী-কদমতলী এলাকার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে নাদিমকে কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি তার কোনো চিকিৎসা সনদও পাওয়া যায়নি।

নেপথ্যে ৫৬ লাখ টাকার লেনদেন

পিবিআইয়ের তদন্তে মামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে বাদীর বাবা এস এম ইকরাম উদ্দিন শিহাবের ব্যক্তিগত বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। ইকরাম এক সময় ট্রাভেল ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। মামলার ৩৩ ও ৫৩ নম্বর আসামি মো. তারিক মামুনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তারিককে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো এবং পরে তার পরিবারকে গ্রিন কার্ড করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ইকরাম ৫৫ লাখ টাকা নেন।

প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত দিতে না পারায় ইকরাম এলাকা ছাড়েন। এ নিয়ে স্থানীয় সালিসে ইকরামের পরিবারের জমির দলিল তারিকের কাছে জিম্মা রাখা হয়। পরে ২০১৯ সালে ইকরাম কিস্তিতে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করলেও তা পূরণ করেননি। উল্টো সালিসকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই পাওনাদারদের এই নতুন মামলায় আসামি করা হয়।

আসামির তালিকায় নানা-মামা

পারিবারিক দ্বন্দ্বে প্রতিহিংসা কতদূর যেতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে এই মামলার আসামি তালিকায়। তদন্তে দেখা গেছে, বাদীর বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর পারিবারিক কলহ তীব্র রূপ নেয়। এর জেরে নাদিমের নানা, মামা, খালা ও খালুসহ আত্মীয়দের আসামি করা হয়। অথচ এই আত্মীয়দের অনেকের সন্তানও জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হয়েছিলেন।

জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে ১৫২ নম্বর বিবাদী মোহাম্মদ ফজলুল হক ও তার ছেলেকেও আসামি করা হয়। পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘আহত হওয়ার বিষয়ে কোনো চিকিৎসা সনদ না থাকা এবং নিজের মা-সহ স্বজনদের অভিযুক্ত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

তদন্ত শেষে পিবিআই জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও আর্থিক বিরোধের প্রতিশোধ নিতেই এই মামলা সাজানো হয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সবাইর খালাস চেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ম্যানেজ মাস্টার নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের দুর্নীতি

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় সন্তানকে দিয়ে শেখ হাসিনাসহ ৩১০ জনের বিরুদ্ধে ‘জুলাই মামলা’

আপডেট সময় ১২:২৭:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহ এবং দেনা-পাওনার বিরোধ গড়িয়েছে জুলাই আন্দোলনের মামলায়। এস এম ইফতেখার উদ্দিন নাদিম নামের ১৬ বছরের এক কিশোর বাদী হয়ে এ মামলা করে। এতে আসামি করা হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩১০ জনকে। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। জানা গেছে, বাবার পাওনাদার এবং মায়ের আত্মীয়দের ফাঁসাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতের নাটক সাজিয়ে এই মামলা করা হয়েছিল।

গত বছরের ৬ আগস্ট এস এম ইফতেখার উদ্দিন নাদিম নামের এক কিশোর আদালতে মামলাটি দায়ের করে। এতে সে নিজেকে জুলাই আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ও আহত হিসেবে দাবি করে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়।

নাদিম তার এজাহারে দাবি করে, ১৯ জুলাই কদমতলী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে থাকা অবস্থায় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ছোড়া একটি গুলি তার মাথায় লাগে। এরপর তাকে মারধর করে অচেতন অবস্থায় কদমতলী থানায় সোপর্দ করা হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর সে মুক্তি পায়। পরে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই। এতে বলা হয়, নাদিমের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।

পিবিআই উল্লেখ করেছে, ‘বাদীর আরজিতে বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে বিবাদীদের জড়িত থাকার পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাদী ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে আহত হয়েছে, এমন কোনো দালিলিক নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং যাত্রাবাড়ী-কদমতলী এলাকার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে নাদিমকে কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি তার কোনো চিকিৎসা সনদও পাওয়া যায়নি।

নেপথ্যে ৫৬ লাখ টাকার লেনদেন

পিবিআইয়ের তদন্তে মামলার নেপথ্য কারণ হিসেবে বাদীর বাবা এস এম ইকরাম উদ্দিন শিহাবের ব্যক্তিগত বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে। ইকরাম এক সময় ট্রাভেল ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। মামলার ৩৩ ও ৫৩ নম্বর আসামি মো. তারিক মামুনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। তারিককে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো এবং পরে তার পরিবারকে গ্রিন কার্ড করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ইকরাম ৫৫ লাখ টাকা নেন।

প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত দিতে না পারায় ইকরাম এলাকা ছাড়েন। এ নিয়ে স্থানীয় সালিসে ইকরামের পরিবারের জমির দলিল তারিকের কাছে জিম্মা রাখা হয়। পরে ২০১৯ সালে ইকরাম কিস্তিতে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করলেও তা পূরণ করেননি। উল্টো সালিসকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই পাওনাদারদের এই নতুন মামলায় আসামি করা হয়।

আসামির তালিকায় নানা-মামা

পারিবারিক দ্বন্দ্বে প্রতিহিংসা কতদূর যেতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে এই মামলার আসামি তালিকায়। তদন্তে দেখা গেছে, বাদীর বাবার সঙ্গে তার মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের পর পারিবারিক কলহ তীব্র রূপ নেয়। এর জেরে নাদিমের নানা, মামা, খালা ও খালুসহ আত্মীয়দের আসামি করা হয়। অথচ এই আত্মীয়দের অনেকের সন্তানও জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহত হয়েছিলেন।

জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে ১৫২ নম্বর বিবাদী মোহাম্মদ ফজলুল হক ও তার ছেলেকেও আসামি করা হয়। পিবিআই তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘আহত হওয়ার বিষয়ে কোনো চিকিৎসা সনদ না থাকা এবং নিজের মা-সহ স্বজনদের অভিযুক্ত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

তদন্ত শেষে পিবিআই জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও আর্থিক বিরোধের প্রতিশোধ নিতেই এই মামলা সাজানো হয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সবাইর খালাস চেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।