ঢাকা ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে বেশি সময় লাগবে না : ট্রাম্প কেন্দ্রীয় চুক্তিতে যে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ভারত পিএসএলে নিরাপত্তা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্বেগ, যা বলছে পিসিবি যমুনায় সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী পাটুরিয়ায় যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পারাপারে চলছে ১৮টি লঞ্চ চট্টগ্রামে ডিসির নির্দেশে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ মন্ত্রী-এমপিরা কে কোথায় ঈদ করবেন? ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন শরীয়তপুর জেলা বি এন পি সাংগঠনিক সম্পাদক ও সখিপুর থানা বি এন পির আহ্বায়ক এস এম এ হামিদ ঈশ্বরদী থেকে এলো উদ্ধারকারী ট্রেন, সৈয়দপুর থেকে আসছে আরেকটি রূহানীনগর এর পক্ষ থেকে সম্মানিত ইমাম-মুয়াজ্জিনগণকে  হাদিয়া প্রদান
চট্টগ্রাম ওয়াসায় ‘সিস্টেম লস’ নাকি পুকুর চুরি

৮০ কোটি টাকার পানি উধাও, দায় এড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ

কাগজে-কলমে উৎপাদন ও বিতরণের হিসাবে কোনো কমতি নেই। খরচও দেখানো হচ্ছে পাই পাই করে। কিন্তু মাস শেষে রাজস্ব আদায়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে এক বিশাল শূন্যতা। চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত এক অর্থবছরেই উধাও হয়ে গেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতিকে সংস্থাটি স্রেফ ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে চালিয়ে দিলেও এর পেছনে বড় ধরনের অনিয়ম ও চুরির ইঙ্গিত মিলছে।

হিসাবে বড় শুভঙ্করের ফাঁকি
ওয়াসার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট পানি উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ১৯৬ কোটি লিটার। সরবরাহের দাবিও করা হয়েছে সমপরিমাণ। কিন্তু বিক্রির হিসাবে দেখা যাচ্ছে মাত্র ১২ হাজার ৭১৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির ২৬ শতাংশই রাজস্বের আওতায় আসেনি। এই ৪ হাজার ৪৭০ কোটি লিটার পানির উৎপাদন মূল্য প্রায় ৮০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। এই সময়েও প্রায় ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকার পানি রাজস্বহীন রয়ে গেছে।

চুরিকেই ‘বৈধতা’ দেওয়ার অগ্রিম পরিকল্পনা
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল অপচয় বা চুরি ঠেকানোর বদলে কর্তৃপক্ষ যেন এটিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাইছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে আগেভাগেই ২০ শতাংশ সিস্টেম লস ধরে রাখা হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পানি চুরি বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে বরং সরকারি কোষাগারের ক্ষতিকেই আগাম স্বীকৃতি দিচ্ছে সংস্থাটি।

লোকবল সংকট বনাম সিন্ডিকেট বাণিজ্য
ওয়াসা কর্তৃপক্ষের দাবি, ৮৬ হাজারের বেশি গ্রাহকের জন্য মিটার রিডার আছেন মাত্র ৩৭ জন। এই লোকবল সংকটের সুযোগ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ের অভিযোগ: অসাধু কর্মচারী ও কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে পানি চুরি করে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্মার্ট মিটারের ব্যর্থতা: অনিয়ম ঠেকাতে ৩ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হলেও তার কোনো সুফল মেলেনি। অথচ সমাধান হিসেবে আরও ১ লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপনের নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

নীরবতায় দায়িত্বশীলরা
এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারমিন আলমকে একাধিকবার মেসেজ ও ফোন করা হলেও তারা কোনো সদুত্তর দেননি। কর্মকর্তাদের এই রহস্যজনক নীরবতা দুর্নীতির অভিযোগকে আরও জোরালো করছে।

বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক উদ্বেগ
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বছরের পর বছর যান্ত্রিক ত্রুটি বা লোকবল সংকটের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি টাকার লুটপাটকে জায়েজ করার সুযোগ নেই। প্রতি মাসে মাত্র ৮-১০টি লোকদেখানো অভিযান এই বিশাল চুরির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই ‘পানি চোর’ সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা না গেলে চট্টগ্রাম ওয়াসা দেউলিয়া হওয়ার পথে এগোবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে বেশি সময় লাগবে না : ট্রাম্প

চট্টগ্রাম ওয়াসায় ‘সিস্টেম লস’ নাকি পুকুর চুরি

৮০ কোটি টাকার পানি উধাও, দায় এড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ

আপডেট সময় ০৫:১৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কাগজে-কলমে উৎপাদন ও বিতরণের হিসাবে কোনো কমতি নেই। খরচও দেখানো হচ্ছে পাই পাই করে। কিন্তু মাস শেষে রাজস্ব আদায়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে এক বিশাল শূন্যতা। চট্টগ্রাম ওয়াসায় গত এক অর্থবছরেই উধাও হয়ে গেছে প্রায় ৮০ কোটি টাকার পানি। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতিকে সংস্থাটি স্রেফ ‘সিস্টেম লস’ হিসেবে চালিয়ে দিলেও এর পেছনে বড় ধরনের অনিয়ম ও চুরির ইঙ্গিত মিলছে।

হিসাবে বড় শুভঙ্করের ফাঁকি
ওয়াসার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট পানি উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ১৯৬ কোটি লিটার। সরবরাহের দাবিও করা হয়েছে সমপরিমাণ। কিন্তু বিক্রির হিসাবে দেখা যাচ্ছে মাত্র ১২ হাজার ৭১৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ উৎপাদিত পানির ২৬ শতাংশই রাজস্বের আওতায় আসেনি। এই ৪ হাজার ৪৭০ কোটি লিটার পানির উৎপাদন মূল্য প্রায় ৮০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসের চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। এই সময়েও প্রায় ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকার পানি রাজস্বহীন রয়ে গেছে।

চুরিকেই ‘বৈধতা’ দেওয়ার অগ্রিম পরিকল্পনা
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল অপচয় বা চুরি ঠেকানোর বদলে কর্তৃপক্ষ যেন এটিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাইছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে আগেভাগেই ২০ শতাংশ সিস্টেম লস ধরে রাখা হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পানি চুরি বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে বরং সরকারি কোষাগারের ক্ষতিকেই আগাম স্বীকৃতি দিচ্ছে সংস্থাটি।

লোকবল সংকট বনাম সিন্ডিকেট বাণিজ্য
ওয়াসা কর্তৃপক্ষের দাবি, ৮৬ হাজারের বেশি গ্রাহকের জন্য মিটার রিডার আছেন মাত্র ৩৭ জন। এই লোকবল সংকটের সুযোগ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ের অভিযোগ: অসাধু কর্মচারী ও কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে পানি চুরি করে বিক্রি করা হচ্ছে।

স্মার্ট মিটারের ব্যর্থতা: অনিয়ম ঠেকাতে ৩ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হলেও তার কোনো সুফল মেলেনি। অথচ সমাধান হিসেবে আরও ১ লাখ স্মার্ট মিটার স্থাপনের নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

নীরবতায় দায়িত্বশীলরা
এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারমিন আলমকে একাধিকবার মেসেজ ও ফোন করা হলেও তারা কোনো সদুত্তর দেননি। কর্মকর্তাদের এই রহস্যজনক নীরবতা দুর্নীতির অভিযোগকে আরও জোরালো করছে।

বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক উদ্বেগ
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বছরের পর বছর যান্ত্রিক ত্রুটি বা লোকবল সংকটের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি টাকার লুটপাটকে জায়েজ করার সুযোগ নেই। প্রতি মাসে মাত্র ৮-১০টি লোকদেখানো অভিযান এই বিশাল চুরির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই ‘পানি চোর’ সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করা না গেলে চট্টগ্রাম ওয়াসা দেউলিয়া হওয়ার পথে এগোবে।