গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে শিক্ষা খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সংস্থা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) ঘিরে যে অভিযোগগুলো সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে, তা দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহজাহান আলীর নাম, যাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধান ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ বছরে এমন কোনো সরকারী প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন ব্যাহত হয়নি। সেই তালিকায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর অন্যতম। এই অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে বদলি-পদায়ন, টেন্ডার বণ্টন, প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট বলয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এই বলয়ের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে শাহজাহান আলীর নাম বারবার উঠে আসছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহজাহান আলী ছিলেন অধিদপ্তরের সাবেক ক্যাশিয়ার ও ডেস্ক-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী। সেই সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষ বাণিজ্য এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ জমতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিনি নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অধিদপ্তরের ভেতরে শাহজাহান আলীর প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তার পছন্দের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত বদলির মুখে পড়তে হতো। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অধিদপ্তরের অন্তত তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হলেও শাহজাহান আলীর হস্তক্ষেপে তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর ফলে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী প্রায় এক মাস ধরে বদলিকৃত কর্মস্থল যশোরে যোগ দিতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটান।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলানোর কথা থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ। জুলাই আন্দোলনের পর শাহজাহান আলী কৌশলে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্গঠন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও প্রকাশ্যে খুব কমই কেউ মুখ খুলতে সাহস করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, শাহজাহান আলীর এই রাজনৈতিক রূপান্তর কোনো আদর্শগত পরিবর্তনের ফল নয়, বরং ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখার কৌশলমাত্র। এর ফলে অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতির সিন্ডিকেট নতুন বাস্তবতায়ও কার্যকর রয়েছে। জেলা পর্যায়ের প্রকৌশলীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য সমন্বয়কারী হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সর্বশেষ চারজন প্রধান প্রকৌশলীই বিভিন্ন সময়ে শাহজাহান আলীর চাপ ও নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়-ঘনিষ্ঠ লবির ইঙ্গিতে স্বস্তিতে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, তার পছন্দের বাইরে সিদ্ধান্ত নিলে সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বদলি কিংবা প্রশাসনিক চাপের ফাইল দ্রুত এগিয়ে যেত। এতে করে অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও কার্যত একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ বলয়ের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনের পর নতুন করে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ জেলা পর্যায়ে সামনে আসছে, তার নেপথ্য সমন্বয়কারী হিসেবেও শাহজাহান আলীর নাম উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, আসবাবপত্র ক্রয় ও অবকাঠামো নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফল। আর সেই নিয়ন্ত্রণের সুতো টেনে ধরেছেন শাহজাহান আলী।
তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চূড়ান্ত বিল ছাড়ের আগে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ আদায়। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ আদায় না হলে বিল আটকে রাখা হতো কিংবা অযৌক্তিক আপত্তি তুলে বিল ছাড়ে বিলম্ব করা হতো। একই সঙ্গে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও উৎকোচ গ্রহণ ও স্বজনপ্রীতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তৎকালীন তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে আসবাবপত্র সরবরাহ প্রকল্পে আহবান করা দরপত্রগুলোর বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের অনুকূলে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়নের সময় যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষা করে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ওপর প্রশাসনিক ও অনানুষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
ঠিকাদারদের একাংশ তখন অভিযোগ করেছিলেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় তারা আর অংশ নিতে আগ্রহী নন। কেউ কেউ অভিযোগ করলেও পরবর্তীতে নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্প বণ্টন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ।
শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও নতুন নয়। বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি রংপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছেন, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং নিজ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি দ্রুত বদলি নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন বলে তখন দাবি করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তদন্ত বা নিষ্পত্তি জনসম্মুখে আসেনি।
রংপুর বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে হঠাৎ করেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি দ্রুত ‘স্নান ত্যাগ’ করে অর্থাৎ দায়িত্ব ছেড়ে অন্যত্র বদলি নেন, যাতে তদন্তের চাপ এড়ানো যায়। তবে বদলির মাধ্যমে অভিযোগের সমাধান না হয়ে বরং তা ধামাচাপা পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বিশ্বস্ত সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবে প্রশাসনের ভেতরে এই অভিযোগ নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় বদল এবং আর্থিক লেনদেনের সমন্বয়েই তিনি বারবার বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় বদলের বিতর্ক এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়মের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে যদি এভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি চলে, তবে এর প্রভাব সরাসরি শিক্ষার পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একই ব্যক্তি যদি প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, তবে প্রশাসনিক সংস্কার কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাদের মতে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে শাহজাহান আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার নীরবতাও অভিযোগগুলোকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অনেকের প্রশ্ন, যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হয়, তবে তিনি প্রকাশ্যে এসে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করছেন না কেন?
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। তবে শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি বিবেচনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। অন্যথায় শিক্ষা খাতের উন্নয়নের নামে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















