আধুনিক বিশ্বায়নের ফলে তুলনামূলক কম দামে অধিক টেকসই সিলভার, মেলামাইন ও প্লাস্টিক সামগ্রীর দাপটে মাটির তৈরী বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা দিনদিন কমে যাওয়ায় ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের উত্তর বাটামারা কুড়ালিয়া কুমারকান্দি গ্রামের কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এক সময়ের চাহিদার তুঙ্গে থাকা মৃৎশিল্প কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে মৃৎশিল্পের কারিগরদের অর্ধাহারে অনাহারে দুর্বিষহ দিন কাটছে। সংসার চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ভালো নেই তাদের সামাজিক সহ পারিপার্শ্বিক অবস্থানও।
ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ‘মৃৎশিল্প’ শব্দটি ‘মৃৎ’ এবং ‘শিল্প’ এই দুই শব্দের মিলিত রূপ। ‘মৃৎ’ শব্দের অর্থ মৃত্তিকা বা মাটি আর ‘শিল্প” বলতে এখানে সুন্দর ও সৃষ্টিশীল বস্তুকে বোঝানো হয়েছে। এজন্য মাটি দিয়ে দিয়ে তৈরি সব শিল্পকে কর্মকেই মৃৎশিল্প বলা যায়। এই ধরণের কাজের সাথে জড়িত তাদেরকে কুমার বা কুম্ভকার বলা হয়। মৃৎশিল্প মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কার। খ্রিষ্টপূর্ব ২৯ হাজার থেকে ২৫ হাজার অব্দের নব্যপ্রস্তর যুগে এর সূচনা। ইতিহাস অনুযায়ী চীনের বিখ্যাত শহর থাংশান এ মৃৎশিল্পের জন্ম হয়েছিল। আর এ কারণেই এ শহরটিকে মৃৎশিল্পের শহর বলা হয়। নব্যপ্রস্তরযুগে চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রাভেতিয়ান সভ্যতার ডলনে ভোসনিসে, জাপানের জোমোন (খ্রিষ্টপূর্ব ১০,৫০০), রাশিয়ার সর্ব পূর্বে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৪,০০০), সাব-সাহারান দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এর আবিস্কারের তথ্য পাওয়া যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্ব পুরুষদের পেশা ধরে রাখতে এখনো অনেক পরিবার তাদের হাতের নান্দনিক ছোঁয়ায় মাটির থালা-বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, ঘটি-বাটি, বদনা, পুতুল, ফুলের টব, ফুলদানী, জীবজন্তু, পাখিসহ বাংলার চিরাচরিত সব নিদর্শণ তৈরি করছেন। বিগত ১৫-২০ বছর আগেও এই উপজেলায় প্রায় শতাধিক কুমার পরিবার ছিল। কিন্তু বাজারের মৃৎশিল্পের কদর কমে যাওয়ায় পেশাগত পরিবর্তনের কারণে তা অনেকটাই কমে গেছে। এখনো সবচেয়ে বেশি কুমার পরিবারের বসবাস বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে কুমারকান্দি গ্রামে।এই গ্রামে এখন ৬ টি পরিবার এখনো টিকে আছে, যারা বাপ দাদার পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও।
উত্তর বাটামারা কুড়ালিয়া কুমারকান্দি গ্রামের তেমনি এক পরিবারের সদস্য চিত্তরঞ্জন পাল (৭০ ) বলেন, আমার বাপ দাদারা এই পেশার সাথে জড়িত তাই আমি ও সেই বাপ দাদার স্মৃতি জড়িয়ে ধরে এখনো বেঁচে আছি এই পেশার সাথে । আমার এখানে ৬ জন শ্রমিক কাজ করে , আগে মাটি দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করতাম , এখন দধির টালি , পাতিল, রসের হাড়ি তৈরি করি। ভালো মাটি পাওয়া যায়না , যে মাটি পাওয়া যায় সেগুলোর সাথে বালি মিশানো থাকে৷ এই এলাকায় এখন আর মাটি পাওয়া যায় না। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি ভ্যানে করে কিনে আনতে হয়। তাতে করে মাটির দাম, ভ্যান ভাড়ার খরচ বেড়ে যায়। সেই অনুযায়ী আয় হয় না। এই শিল্পটি আর আগের মত নেই। স্টিল, সিরামিক, মেলামাইন, প্ল্যাস্টিক ও সিলভারের তৈজসপত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এখন মাটির জিনিষের চাহিদা নাই বললেই চলে। বেচা-বিক্রি কমে গেছে।
তিনি আরও জানান, অনেকেই পেশা বদল করছেন। সরকার থেকে আমরা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাইনা। আগে এই এলাকার প্রায় অধিকাংশ পরিবারই এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন মাত্র ৬ টি পরিবার এই কাজের সাথে যুক্ত আছি। আমরা যারা এই পেশার মায়া ছাড়তে পারছি না, তারা কষ্ট হলেও বাপ-দাদার এই পেশাটাকে ধরে রেখেছি, এতে যে পরিমাণ আয় হয় তা দিয়ে এই সময় জিনিস পত্রের দাম বেশি আর ছেলে মেয়ে পড়াশোনার খরচ সাথে সাংসারিক খরচ জোগান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ।
কুমারকান্দি গ্রামের ভারত পালের বাড়ির কুমার পরিবারের সদস্য নয়ন পাল (৩৫) জানান, আমরা বাপ চাচা মিলে মোট ৭ জন কারিগর হিসেবে কাজ করি , সাথে আমাদের ছেলে মেয়ে স্ত্রীরা ও সহযোগিতা করেন এই কাজে। প্রতিদিন আমরা ২০০-২৫০ টি টালি তৈরি করতে পারি। আর পহেলা বৈশাখে আমরা মাটি দিয়ে ঘোড়া , ফুলের টব , পুতুল আরও অনেকে কিছু তৈরি করি । বিদ্যুৎ লোডশেডিং এর জন্য আমরা ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রতি পিচ দধির টালি আমরা ২০-২৫ টাকা বিক্রি করি। এসব টালি, পাতিল আমরা বিভিন্ন পরিবহনে করে কাঁচা রাস্তা দিয়ে বোরহানউদ্দিন উপজেলার কুনজেরহাট বাজার, বোরহানগঞ্জ বাজার , বোরহানউদ্দিন সদর উপজেলা সহ পাশে দৌলতখাঁন উপজেলায় সরবরাহ করি বিভিন্ন দধি বিক্রেতার কাছে । এসব মালামাল সরবরাহ করতে গিয়ে কাচা রাস্তা দিয়ে অনেক সময় আমাদের মাটির তৈরি জিনিস গুলো ভেঙে যায় এতে আমরা লোকসানের মুখে পড়তে হয়। তিনি বলেন , শুধু শুনেই থাকি এই শিল্পের কারিগরদের জন্যে নাকি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সহ সরকার থেকে অনেক সুবিধা দেয়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই পাইনা। শুনেছি সমাজসেবা অফিস থেকে নাকি এই মাটির জিনিসপত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে ঋণও দেয়। কিন্তু আমরা তো শিক্ষিত না যে এত কিছু বুঝবো। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত অনেক লোকই আসছে, যারা শুধু এসে নাম, ঠিকানা আর ছবি তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না।
১। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার
২। উন্নত প্রশিক্ষণ
৩। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ
৪। পাকা সড়কের ব্যবস্থা।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান উজ্জামান এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কালের বিবর্তনে অনেক পুরনো শিল্প আজ হারিয়ে যা্চ্ছে মৃৎশিল্প তার মধ্যে অন্যতম। কুমাররা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সরকার সর্বস্তরের পেশার জনগণের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের তৈরি সামগ্রী গুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত বিক্রি করতে পারে দ্রুত সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা করছি। এই পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করার চেষ্টা করবো।
রিয়াজ ফরাজী (ভোলা) 
























