ঢাকা ০৬:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হাতকড়াসহ আদালত চত্বর থেকে পালালেন মাদক মামলার আসামি যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ দুর্যোগ, ঘর হারাল ৬৭ হাজার মানুষ চাঁপাইনবাবগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে ৩০০ শিক্ষার্থীর মাঝে গাছের চারা বিতরণ নরসিংদীতে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার, গ্রেফতার ৪৯ বগুড়ার সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আর কত দিন লাগবে, জানালেন জ্বালানি মন্ত্রী গ্যাসের দাম এক টাকাও বাড়ালে সরকার টিকতে পারবে না : নাহিদ ইসলাম শিবির করায় ববির এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীকে ছাত্রদলের মারধর, অতঃপর চাকরিচ্যুত জুলাই দিবস পালন শেষে জাজিরা উপজেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ১২ হাজার টাকার ঋণ, ১৩ লাখ টাকার মামলা; বালিয়াডাঙ্গীতে গ্রেপ্তার সুদ ব্যবসায়ী

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: এক রাজনৈতিক পুনর্নির্মাণ

  • মোঃ ইউসুফ
  • আপডেট সময় ০৪:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৭৭২ বার পড়া হয়েছে

গত কয়েক দিন ধরে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মনোজগতে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে হয়ত দীর্ঘ ১৭ বছর পর, বিদেশি নির্বাসিত জীবনের পর, তারেক রহমান কি রাজনৈতিক মঞ্চে নতুনভাবে প্রবেশ করবেন? এবং যদি প্রবেশ করেন, কি ছাপ রেখে যেতে পারবেন? বিবিসি বাংলার সঙ্গে সদ্য অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারটি এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আলো ছড়িয়েছে, যেখানে ‘জনমতের শক্তি’ ও ‘প্রত্যাবর্তন’ দুইটি কী ধারণা গঠন করেছে তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক রূপায়ণের জন্য।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান মূলত কয়েকটি বার্তা দিয়েছেন ক্ষমতায় ফেরা নয়, জনগণের সঙ্গে থাকা তার প্রধান অঙ্গীকার; নির্বাচন হবে জনগণের শক্তিতে; কোনো ব্যক্তি নয়, জনগণই (যেমন ২০২৪ সালের জুলাই-গণঅভ্যুত্থান) দিনের একমাত্র ‘মাস্টারমাইন্ড’।
এই বার্তাগুলি শুধু রাজনৈতিক করাসামরিক কৌশল নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট দর্শন ও কর্মদিশার সূচনা। “জনমতের শক্তি” এমন একটি ধারণা যেখানে নেতার শক্তি তাঁর জনপ্রিয়তায়, জনমতের সংহতিতে নির্ধারিত হবে তা যদি রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়, তা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ার সম্ভাবনা রাখে।
তারেক রহমান বারবার পয়েন্ট করেছেন, কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনমতের সিদ্ধান্ত। এই অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দল, নেতা কিংবা নির্বাচন সবকিছুই জনগণের সমর্থন ও প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল হবে।
কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের শিক্ষা দেয়, জনমতের দাবিকে সংগ্রহ ও রূপ দেওয়া তত সহজ নয়। জনমতের প্রতি আস্থা রাখতে হয় ক্রমানুবর্ধক কাজ, দৃঢ় অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে। জনমতের তত্ত্ব যদি শুধু বক্তৃতা ও স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তা বাস্তব রাজনীতিতে কার্যকরভাবে উত্তীর্ণ হবে কি না সেটিই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের প্রচার যে ব্যাপারে ছিল — গত এক বছর ধরে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবান দিক নির্দেশনা, নানাবিধ বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়া, পার্টি সংগঠন ও জনমাঠে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই কথাগুলি জনমতের গভীরে গিয়ে কীভাবে রূপ নেবে — সেটাই এখন দেখার বিষয়।সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেছেন, দেশে ফিরতে কিছু “সংগত কারণ” রয়ে গেছে, তবে “দ্রুতই” দেশে আসবেন আশা করছেন। দেশে ফিরে আসা কেবল প্রতীকী দৃশ্য হবে না; তা হবে আরও সক্রিয় রাজনৈতিক উদ্যোগ ও নেতৃত্ব প্রদানের সূচনা।
প্রত্যাবর্তন মানে শুধু শহরে আসা নয় তা একটি পরিকল্পিত এবং সংহত কর্মসূচিটি মাঠে নামিয়ে আনা, নেতৃত্ব সম্ভাব্যতা যাচাই করা, দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মেরামত ও সংস্কার কাজ করা হচ্ছে প্রত্যাবর্তনের আগেই প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে।
তবে এখানে একটি বড় প্রশ্ন খাড়া হয় সরকার কিংবা শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, নজরদারি, আইন-আদালত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ এসব কীভাবে সামলাবে? কীভাবে নিশ্চিত হবে যে রাজনৈতিক আশ্রয় ও কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে বাধাদি না দাঁড়ায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া, প্রত্যাবর্তন আদর্শ মাত্রায় থেমে যেতে পারে।
প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলকে নতুনভাবে টানা লাগবে শৃঙ্খলাবদ্ধ দলগঠন, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ, একাধিক গুণসম্পন্ন নেতৃত্ব বিকাশের পথ প্রশস্ত করা। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে যে জনসমর্থন আছে, তাঁকেই বিএনপি মনোনয়ন দেবে।
এ ধরনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া দলকে স্বচ্ছ ও জনমতের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলতে পারে। তবে তা উদ্যোগ, নির্ভরযোগ্যতা এবং ফলো-আপ ছাড়া মিথ্যাচার হয়ে যেতে পারে। দলের অভ্যন্তরীণ সুসংগঠন, মানদণ্ড নির্ধারণ ও দিমুক্ত বিষয়ের ওপরে কঠোর নজর রাখতে হবে।
এছাড়া, দলীয় নীতির প্রশ্নে আরও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নির্বাচন নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন, দেদার করা ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এই বিষয়গুলি হবে আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তবে এ পরিচয়কে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপদান, অর্থাৎ রাজনৈতিক নীতিকে জনগণের কাজের সঙ্গে সংযোগ করা সেই নির্মাণ দায়িত্ব সবচেয়ে বড়।
বিবিসি সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেছেন, নির্বাচন হবে জনগণের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জনগণের হাতে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে জনমতের শক্তিকে কেন্দ্রবিন্দু করে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে উঠতে পারে।
তবে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনেক বাধাপ্রতিকূলতা আছে ইসি স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ, মিডিয়া স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভোট গ্রহণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এগুলো যদি প্রস্তুত না হয়, নির্বাচনের স্বীকৃতি এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন উচ্চ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা, মূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় ও স্বাধীনতা। একজন নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে এই প্রত্যাশার সঙ্গে নিজকে মিলিয়ে নিতে হবে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয় বাস্তব কর্মসূচি, মডেল ও যুক্তিসম্পন্ন পরিকল্পনা লাগবে।
কোনো রূপায়ণই চ্যালেঞ্জবিহীন নয়। তারেক রহমান প্রবাসে দীর্ঘ সময় ছিলেন সেই অভিজ্ঞতা এবং কল্পনাপ্রসূত রাজনৈতিক কৌশল প্রতিদিনের বাস্তব রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক হবে সেই প্রশ্ন খাটো নয়।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা শক্তিশালী। ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসনিক প্রভাব, আইন-আদালতের মাধ্যম সব কিছুই প্রতিরোধ গড়ে দিতে পারে। জনগণের মিলিত বিকল্প যদি না গড়া যায়, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও বিভাজিত থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, জনমতের বাহ্যিক প্রকাশ (যেমন ভোট, গণমাধ্যম সমর্থন, জনসভা) ও গূঢ় জনমতের (স্বাধীনতা, অনুপ্রেরণা, বিশ্বাস) মধ্যে ফাঁক থাকে। সেই ফাঁক ভরাট করতে হবে সাংগঠনিক কার্যক্রম, Grassroots কাজ, জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক গড়বেই হবে।
চতুর্থত, প্রত্যাবর্তনের সময়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপে থাকা বিষয়গুলিই একটি বাস্তব ঝুঁকি। তিনি নিজেই বলেছেন, কিছু শঙ্কার কথা শুনেছেন।
সব প্রধান বাধা সত্ত্বেও, জনমতের শক্তিতে বিশ্বাস একটি রাজনৈতিক কণ্ঠবৎ অভিমুখ নির্দেশ করে এবং সেই অভিমুখ যদি সঠিকভাবে রূপ নেয়, তা একটি নতুন সময়ের সূচনা হতে পারে।
তারেক রহমানের বিবিসি বাংলা সাক্ষাৎকার শুধু একটি সংবাদমুখী প্রচার ছিল না একটি নতুন রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত। জনমতের শক্তির ওপর যে আস্থা, তার প্রতিফলন যদি দল‑জনমুখী বাস্তব কার্যক্রমে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তির ফিরে আসা নয় একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা হতে পারে। তবে সেই সূচনায় সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হবে সংগঠিত পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা ও জনমতের সঙ্গে দায়বদ্ধতা। দৃষ্টিনন্দন বক্তৃতা বা আনা-বাচানো প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সংযোগ গড়ে দিতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তিনি নতুনভাবে ফিরে আসছেন, জনমতের শক্তিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন চলার পথ তৈরি করতে চান। তবে সেই পথ সফল হবে কি না তার উত্তর নির্ধারণ করবে সময়। আমাদের দায়িত্ব হবে, প্রশ্ন করা, মূল্যায়ন করা এবং সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন জনগণ তার অংশীদার হবে।

লেখক :- সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, বেরোবি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাতকড়াসহ আদালত চত্বর থেকে পালালেন মাদক মামলার আসামি

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: এক রাজনৈতিক পুনর্নির্মাণ

আপডেট সময় ০৪:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫

গত কয়েক দিন ধরে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মনোজগতে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে হয়ত দীর্ঘ ১৭ বছর পর, বিদেশি নির্বাসিত জীবনের পর, তারেক রহমান কি রাজনৈতিক মঞ্চে নতুনভাবে প্রবেশ করবেন? এবং যদি প্রবেশ করেন, কি ছাপ রেখে যেতে পারবেন? বিবিসি বাংলার সঙ্গে সদ্য অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারটি এ প্রশ্নগুলোর প্রেক্ষাপটে একটি নতুন আলো ছড়িয়েছে, যেখানে ‘জনমতের শক্তি’ ও ‘প্রত্যাবর্তন’ দুইটি কী ধারণা গঠন করেছে তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক রূপায়ণের জন্য।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান মূলত কয়েকটি বার্তা দিয়েছেন ক্ষমতায় ফেরা নয়, জনগণের সঙ্গে থাকা তার প্রধান অঙ্গীকার; নির্বাচন হবে জনগণের শক্তিতে; কোনো ব্যক্তি নয়, জনগণই (যেমন ২০২৪ সালের জুলাই-গণঅভ্যুত্থান) দিনের একমাত্র ‘মাস্টারমাইন্ড’।
এই বার্তাগুলি শুধু রাজনৈতিক করাসামরিক কৌশল নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট দর্শন ও কর্মদিশার সূচনা। “জনমতের শক্তি” এমন একটি ধারণা যেখানে নেতার শক্তি তাঁর জনপ্রিয়তায়, জনমতের সংহতিতে নির্ধারিত হবে তা যদি রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়, তা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারা গড়ার সম্ভাবনা রাখে।
তারেক রহমান বারবার পয়েন্ট করেছেন, কোনো দল বা ব্যক্তি নয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনমতের সিদ্ধান্ত। এই অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দল, নেতা কিংবা নির্বাচন সবকিছুই জনগণের সমর্থন ও প্রত্যাশার ওপর নির্ভরশীল হবে।
কিন্তু রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের শিক্ষা দেয়, জনমতের দাবিকে সংগ্রহ ও রূপ দেওয়া তত সহজ নয়। জনমতের প্রতি আস্থা রাখতে হয় ক্রমানুবর্ধক কাজ, দৃঢ় অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে। জনমতের তত্ত্ব যদি শুধু বক্তৃতা ও স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তা বাস্তব রাজনীতিতে কার্যকরভাবে উত্তীর্ণ হবে কি না সেটিই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের প্রচার যে ব্যাপারে ছিল — গত এক বছর ধরে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবান দিক নির্দেশনা, নানাবিধ বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়া, পার্টি সংগঠন ও জনমাঠে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই কথাগুলি জনমতের গভীরে গিয়ে কীভাবে রূপ নেবে — সেটাই এখন দেখার বিষয়।সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেছেন, দেশে ফিরতে কিছু “সংগত কারণ” রয়ে গেছে, তবে “দ্রুতই” দেশে আসবেন আশা করছেন। দেশে ফিরে আসা কেবল প্রতীকী দৃশ্য হবে না; তা হবে আরও সক্রিয় রাজনৈতিক উদ্যোগ ও নেতৃত্ব প্রদানের সূচনা।
প্রত্যাবর্তন মানে শুধু শহরে আসা নয় তা একটি পরিকল্পিত এবং সংহত কর্মসূচিটি মাঠে নামিয়ে আনা, নেতৃত্ব সম্ভাব্যতা যাচাই করা, দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মেরামত ও সংস্কার কাজ করা হচ্ছে প্রত্যাবর্তনের আগেই প্রস্তুতির ইঙ্গিত হিসেবে।
তবে এখানে একটি বড় প্রশ্ন খাড়া হয় সরকার কিংবা শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন, নজরদারি, আইন-আদালত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ এসব কীভাবে সামলাবে? কীভাবে নিশ্চিত হবে যে রাজনৈতিক আশ্রয় ও কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে বাধাদি না দাঁড়ায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া, প্রত্যাবর্তন আদর্শ মাত্রায় থেমে যেতে পারে।
প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলকে নতুনভাবে টানা লাগবে শৃঙ্খলাবদ্ধ দলগঠন, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ, একাধিক গুণসম্পন্ন নেতৃত্ব বিকাশের পথ প্রশস্ত করা। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে যে জনসমর্থন আছে, তাঁকেই বিএনপি মনোনয়ন দেবে।
এ ধরনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া দলকে স্বচ্ছ ও জনমতের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলতে পারে। তবে তা উদ্যোগ, নির্ভরযোগ্যতা এবং ফলো-আপ ছাড়া মিথ্যাচার হয়ে যেতে পারে। দলের অভ্যন্তরীণ সুসংগঠন, মানদণ্ড নির্ধারণ ও দিমুক্ত বিষয়ের ওপরে কঠোর নজর রাখতে হবে।
এছাড়া, দলীয় নীতির প্রশ্নে আরও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নির্বাচন নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন, দেদার করা ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এই বিষয়গুলি হবে আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তবে এ পরিচয়কে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপদান, অর্থাৎ রাজনৈতিক নীতিকে জনগণের কাজের সঙ্গে সংযোগ করা সেই নির্মাণ দায়িত্ব সবচেয়ে বড়।
বিবিসি সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেছেন, নির্বাচন হবে জনগণের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জনগণের হাতে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে জনমতের শক্তিকে কেন্দ্রবিন্দু করে একটি নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে উঠতে পারে।
তবে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনেক বাধাপ্রতিকূলতা আছে ইসি স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ, মিডিয়া স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভোট গ্রহণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এগুলো যদি প্রস্তুত না হয়, নির্বাচনের স্বীকৃতি এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন উচ্চ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা, মূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় ও স্বাধীনতা। একজন নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে এই প্রত্যাশার সঙ্গে নিজকে মিলিয়ে নিতে হবে, শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয় বাস্তব কর্মসূচি, মডেল ও যুক্তিসম্পন্ন পরিকল্পনা লাগবে।
কোনো রূপায়ণই চ্যালেঞ্জবিহীন নয়। তারেক রহমান প্রবাসে দীর্ঘ সময় ছিলেন সেই অভিজ্ঞতা এবং কল্পনাপ্রসূত রাজনৈতিক কৌশল প্রতিদিনের বাস্তব রাজনীতিতে কতটা প্রাসঙ্গিক হবে সেই প্রশ্ন খাটো নয়।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা শক্তিশালী। ক্ষমতাসীন দল, প্রশাসনিক প্রভাব, আইন-আদালতের মাধ্যম সব কিছুই প্রতিরোধ গড়ে দিতে পারে। জনগণের মিলিত বিকল্প যদি না গড়া যায়, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও বিভাজিত থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, জনমতের বাহ্যিক প্রকাশ (যেমন ভোট, গণমাধ্যম সমর্থন, জনসভা) ও গূঢ় জনমতের (স্বাধীনতা, অনুপ্রেরণা, বিশ্বাস) মধ্যে ফাঁক থাকে। সেই ফাঁক ভরাট করতে হবে সাংগঠনিক কার্যক্রম, Grassroots কাজ, জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক গড়বেই হবে।
চতুর্থত, প্রত্যাবর্তনের সময়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপে থাকা বিষয়গুলিই একটি বাস্তব ঝুঁকি। তিনি নিজেই বলেছেন, কিছু শঙ্কার কথা শুনেছেন।
সব প্রধান বাধা সত্ত্বেও, জনমতের শক্তিতে বিশ্বাস একটি রাজনৈতিক কণ্ঠবৎ অভিমুখ নির্দেশ করে এবং সেই অভিমুখ যদি সঠিকভাবে রূপ নেয়, তা একটি নতুন সময়ের সূচনা হতে পারে।
তারেক রহমানের বিবিসি বাংলা সাক্ষাৎকার শুধু একটি সংবাদমুখী প্রচার ছিল না একটি নতুন রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের ইঙ্গিত। জনমতের শক্তির ওপর যে আস্থা, তার প্রতিফলন যদি দল‑জনমুখী বাস্তব কার্যক্রমে পরিণত হয়, তাহলে তার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তির ফিরে আসা নয় একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা হতে পারে। তবে সেই সূচনায় সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হবে সংগঠিত পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা ও জনমতের সঙ্গে দায়বদ্ধতা। দৃষ্টিনন্দন বক্তৃতা বা আনা-বাচানো প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে সংযোগ গড়ে দিতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তিনি নতুনভাবে ফিরে আসছেন, জনমতের শক্তিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন চলার পথ তৈরি করতে চান। তবে সেই পথ সফল হবে কি না তার উত্তর নির্ধারণ করবে সময়। আমাদের দায়িত্ব হবে, প্রশ্ন করা, মূল্যায়ন করা এবং সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন জনগণ তার অংশীদার হবে।

লেখক :- সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, বেরোবি