ঢাকা ০৬:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হাতকড়াসহ আদালত চত্বর থেকে পালালেন মাদক মামলার আসামি যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ দুর্যোগ, ঘর হারাল ৬৭ হাজার মানুষ চাঁপাইনবাবগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে ৩০০ শিক্ষার্থীর মাঝে গাছের চারা বিতরণ নরসিংদীতে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার, গ্রেফতার ৪৯ বগুড়ার সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেষ পালের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আর কত দিন লাগবে, জানালেন জ্বালানি মন্ত্রী গ্যাসের দাম এক টাকাও বাড়ালে সরকার টিকতে পারবে না : নাহিদ ইসলাম শিবির করায় ববির এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীকে ছাত্রদলের মারধর, অতঃপর চাকরিচ্যুত জুলাই দিবস পালন শেষে জাজিরা উপজেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলন ১২ হাজার টাকার ঋণ, ১৩ লাখ টাকার মামলা; বালিয়াডাঙ্গীতে গ্রেপ্তার সুদ ব্যবসায়ী

হাজার বছরের আত্মীয়তা: প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সুসম্পর্কের অপরিহার্যতা

  • হাসান
  • আপডেট সময় ১২:১০:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫
  • ৭৫০ বার পড়া হয়েছে

 

ইকবাল জিল্লুল মজিদ
পরিচালক কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাডডা এমসিএইচ এফপি সেনটার

ভূমিকা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়; এই সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি এবং রাজনীতির গভীর মেলবন্ধনের এক অবিচ্ছেদ্য ধারা। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসজুড়ে এ দুটি জাতির মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অপূর্ব মৈত্রীর বন্ধন। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা, সাহিত্যের আদান-প্রদান, এমনকি শিল্প ও বাণিজ্যে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী।

ঐতিহাসিক ভিত্তি: যুগে যুগে সংযুক্ত পথচলা

প্রাচীন যুগে: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের গোড়াপত্তন ঘটে সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন আমলে বাংলার সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন বিহার, ওড়িশা, আসাম, ও দক্ষিণ ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক ছিল।

মধ্যযুগে: মুসলিম শাসনামলেও বাংলার সঙ্গে দিল্লি ও মুঘল দরবারের সম্পর্ক ছিল সুগভীর। ধর্মীয় ভাবধারা, সুফি-সাধুদের প্রভাব দুই দেশকেই একই সাংস্কৃতিক সূত্রে গাঁথে।

বৃটিশ উপনিবেশকাল: ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসনের অধীনে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা একত্রে এক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। এ সময়েই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক ভাবনার গভীর মিল তৈরি হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে অবিস্মরণীয় সহায়তা দিয়েছে, তা কেবল কূটনৈতিক বা সামরিক পর্যায়ে নয়—ভারতীয় জনগণ নিজেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক প্রাণের অংশ করে তুলেছিল।

ভারত প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে ভারতের সরকার।

ভারতের সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক, শিল্পী, সাংবাদিক—সবাই একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক

সীমান্ত বাণিজ্য: বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি-রপ্তানির উৎস।

যাতায়াত ও যোগাযোগ: বাস, রেল, নৌপথ এবং বিমান যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত সহজ হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা: ভারত থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানি করে। একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করছে।

সাংস্কৃতিক বিনিময়: চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, বইমেলা, সাহিত্য উৎসব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের মাঝে আন্তরিক সহযোগিতা বিরাজমান।

ধর্মীয় ও মানবিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

ভারত ও বাংলাদেশের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব, ভাষা, পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাসে প্রচণ্ড মিল রয়েছে।

বাঙালি সংস্কৃতির আত্মিক টান দুই দেশের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।

দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
১. সীমান্ত নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষা দুই দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২. পানি বণ্টন সমস্যা, সীমানা বিরোধ ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া জরুরি।
৩. অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময় উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।
৪. শিক্ষা ও গবেষণা খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই বন্ধন তৈরি সম্ভব।
৫. অবহেলিত সীমান্ত অঞ্চলের উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

সমাপ্তি নয়, আগামীর পথে…
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো, তবে প্রতিনিয়ত নবতর প্রেক্ষাপটে নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে আগামী প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল, উন্নত ও সম্মানজনক প্রতিবেশী বন্ধনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দু’দেশের নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও সংস্কৃতিজনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ হবে আরও উজ্জ্বল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হাতকড়াসহ আদালত চত্বর থেকে পালালেন মাদক মামলার আসামি

হাজার বছরের আত্মীয়তা: প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সুসম্পর্কের অপরিহার্যতা

আপডেট সময় ১২:১০:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ জুলাই ২০২৫

 

ইকবাল জিল্লুল মজিদ
পরিচালক কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাডডা এমসিএইচ এফপি সেনটার

ভূমিকা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়; এই সম্পর্ক ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, অর্থনীতি এবং রাজনীতির গভীর মেলবন্ধনের এক অবিচ্ছেদ্য ধারা। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসজুড়ে এ দুটি জাতির মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অপূর্ব মৈত্রীর বন্ধন। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা, সাহিত্যের আদান-প্রদান, এমনকি শিল্প ও বাণিজ্যে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী।

ঐতিহাসিক ভিত্তি: যুগে যুগে সংযুক্ত পথচলা

প্রাচীন যুগে: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের গোড়াপত্তন ঘটে সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন আমলে বাংলার সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন বিহার, ওড়িশা, আসাম, ও দক্ষিণ ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক ছিল।

মধ্যযুগে: মুসলিম শাসনামলেও বাংলার সঙ্গে দিল্লি ও মুঘল দরবারের সম্পর্ক ছিল সুগভীর। ধর্মীয় ভাবধারা, সুফি-সাধুদের প্রভাব দুই দেশকেই একই সাংস্কৃতিক সূত্রে গাঁথে।

বৃটিশ উপনিবেশকাল: ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসনের অধীনে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা একত্রে এক প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। এ সময়েই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক ভাবনার গভীর মিল তৈরি হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যে অবিস্মরণীয় সহায়তা দিয়েছে, তা কেবল কূটনৈতিক বা সামরিক পর্যায়ে নয়—ভারতীয় জনগণ নিজেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক প্রাণের অংশ করে তুলেছিল।

ভারত প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে ভারতের সরকার।

ভারতের সাধারণ মানুষ, রাজনীতিক, শিল্পী, সাংবাদিক—সবাই একাত্ম হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক

সীমান্ত বাণিজ্য: বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি-রপ্তানির উৎস।

যাতায়াত ও যোগাযোগ: বাস, রেল, নৌপথ এবং বিমান যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত সহজ হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা: ভারত থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানি করে। একাধিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করছে।

সাংস্কৃতিক বিনিময়: চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত, বইমেলা, সাহিত্য উৎসব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের মাঝে আন্তরিক সহযোগিতা বিরাজমান।

ধর্মীয় ও মানবিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

ভারত ও বাংলাদেশের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব, ভাষা, পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাসে প্রচণ্ড মিল রয়েছে।

বাঙালি সংস্কৃতির আত্মিক টান দুই দেশের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।

দুই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
১. সীমান্ত নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষা দুই দেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২. পানি বণ্টন সমস্যা, সীমানা বিরোধ ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া জরুরি।
৩. অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময় উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।
৪. শিক্ষা ও গবেষণা খাতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই বন্ধন তৈরি সম্ভব।
৫. অবহেলিত সীমান্ত অঞ্চলের উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে পারে।

সমাপ্তি নয়, আগামীর পথে…
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো, তবে প্রতিনিয়ত নবতর প্রেক্ষাপটে নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে আগামী প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল, উন্নত ও সম্মানজনক প্রতিবেশী বন্ধনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দু’দেশের নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও সংস্কৃতিজনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ হবে আরও উজ্জ্বল।