মোঃ ইউসুফ
সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
১৬ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অমর দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনে কোটা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শহীদ আবু সাঈদ নিজের রক্ত দিয়ে আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রকৃত মঙ্গল এবং জাতির স্বপ্নপূরণের জন্য যে সংগ্রাম কখনো থেমে থাকা যাবে না। এই ত্যাগ শুধু এক যুবকের জীবনদানের কাহিনী নয়, এটি আমাদের সামনে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার এক মহৎ দায়িত্ব তুলে ধরেছে।
কোটা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ ও দাবির ধ্বনি উঠছিল দেশের তরুণ সমাজের মুখ থেকে। কোটা ছিল একটা বিতর্কিত বিষয়, যা দেশের নানা স্তরে নানা আকারে প্রভাব ফেলেছিল। শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তরুণরা চেয়েছিল যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ পাওয়ার সুবিচার। সেই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদ প্রথম সারিতে ছিলেন। তার বলিদান আমাদেরকে প্রেরণা দেয় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, সঠিক পথে চলার এবং কখনো হাল ছেড়ে না দেওয়ার।
শহীদ আবু সাঈদ শুধু এক যুবক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক আন্দোলনের প্রতীক। তার রক্ত আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি শক্তিশালী ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের একত্রিত হতে হবে। আমাদের মধ্যে বিভাজন বা স্বার্থবিরোধ নয়, একতার চাবিকাঠিই দেশের উন্নয়নের মূল। দেশের প্রতিটি অংশে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমরা মিলেমিশে সামনের দিকে এগোতে পারি।
এই ত্যাগের অর্থ দাঁড়ায় যে, আমরা যেন শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থে নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করি। প্রগতিশীল সমাজ গড়তে হলে শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে, কর্মসংস্থানে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই লক্ষ্য ছাড়া আমাদের জাতির উন্নয়ন অসম্ভব।
কোটা আন্দোলনের মূল দাবিটি ছিল শিক্ষায় ও চাকরিতে প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ নিশ্চিত করা, যা ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এক বছর আগে আজকের দিনে, শহীদ আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে এই দাবি যে শুধু একটা দাবি নয়, বরং দেশের একটি পরিবর্তনের বার্তা তা আমরা প্রত্যেককে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ, কোন দেশ তখনই উন্নত হয় যখন তার নাগরিকেরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সুবিচার পায় এবং নিজের যোগ্যতার মাধ্যমে জাতির সেবা করে।
বাংলাদেশ আজ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন সব মানুষের জন্যই সমান হয়, সেটাই এখন প্রধান লক্ষ্য। সমাজের সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রেখে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, জাতির মেরুদণ্ড হলো ঐক্য। ঐক্যবোধ ছাড়া আমরা বহুদূর যেতে পারব না।
শহীদ আবু সাঈদের ত্যাগ আমাদের সামনে এক বার্তা রেখে গেছে—”একতা, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকা।” তাই আমাদের প্রত্যেককে উচিত তার স্বপ্ন ও আদর্শকে ধরে রেখে দেশের উন্নয়নের জন্য নিজেকে নিবেদিত করা। তরুণ সমাজকে একত্রিত করে, তাদের কর্মযোগে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কারণ, দেশের প্রকৃত শক্তি হলো তার যুবসমাজ।
শহীদ আবু সাঈদের রক্ত আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে যেন আমরা জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে গড়ে তুলি। জাতির প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেশপ্রেম ও ন্যায়বোধের প্রতীক হয়ে উঠে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সুযোগসুবিধা যেন সবার জন্য সমান হয়, আর সমাজের প্রতিটি মানুষের অধিকার রক্ষা পায়। এটাই হবে শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্নপূরণ এবং দেশের প্রতি আমাদের ন্যায়। বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সেই ঐক্যবোধই আমাদের শক্তি, আমাদের অহংকার। আসুন, শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগকে স্মরণ রেখে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচনা করি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























