দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ কমবে এবং পর্যায়ক্রমে ঋণের সুদও কিছুটা কমতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপও তৈরি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, দেশীয় ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, ঋণের সুদ কমলে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, যা বিনিয়োগে সহায়ক হতে পারে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার হল সে হার, যে সুদে তফসিলি ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। এ হার কমলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের ব্যয় কমে এবং তার প্রভাব ঋণের সুদেও পড়ে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, বাজারে ঋণের সুদ এমনিতে কমতে শুরু করেছিল। এখন নীতি সুদহার কমানোর ফলে আরও কমবে। তার মতে, বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে আমানতের সুদও কিছুটা কমবে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা কঠিন। তবে শুধু সুদ কমলে বিনিয়োগ বাড়বে না; জ্বালানি সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে নতুন বিনিয়োগের সূচকও দুর্বল রয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নীতি সুদহার কমানোর সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যাবে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে সুদ কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধি, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নেয়। এতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ শতাংশ থেকে কমে সাড়ে ৮ শতাংশে নেমে এলেও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আবারও টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০ শতাংশ পরিবারকে তাদের মোট আয়ের অর্ধেক খাদ্য কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে।
সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নীতি সুদহার কমানোর ফলে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়বে না। তার দাবি, দেশের মূল্যস্ফীতির বড় কারণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বরং দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
তবে ভিন্নমত দিয়েছেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। তার মতে, নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত এমন বার্তা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, যদিও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা বহাল থাকলে কম সুদহার চাহিদা বাড়াবে, কিন্তু সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও তীব্র হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, টেকসই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু সুদহার কমানো যথেষ্ট নয়। ব্যবসার ব্যয় কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা, অবকাঠামো ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























