রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আবাসন খাত ‘গ্রিন সিটি’কে ঘিরে যে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ একের পর এক সামনে আসছে, তার কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. শওকত আকবরের নাম। সরকারি নিরীক্ষা, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে দেশের অন্যতম বৃহৎ মেগা প্রকল্পটি যেন পরিণত হয়েছিল লাগামহীন অর্থ লুটপাটের উৎসবে। আর এই পুরো সময়টিতে প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মো. শওকত আকবর। ফলে প্রকল্পের প্রতিটি বিতর্কিত কেনাকাটা, অস্বাভাবিক ব্যয় ও আর্থিক অনিয়মের দায় তাঁর দিকেই ঘুরে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপপুর প্রকল্পে বালিশ-কাণ্ডের পর এবার ড্রেসিং টেবিল কেনায় অবিশ্বাস্য ব্যয়ের তথ্য সামনে এসেছে। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে ৩০ হাজার ৫০০ টাকার একটি ড্রেসিং টেবিল সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দরে। মোট ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এই কেনাকাটাগুলো হয়েছে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, যখন প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মো. শওকত আকবর।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই ধরনের পণ্যের দামে অস্বাভাবিক পার্থক্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। কোথাও একটি ড্রেসিং টেবিল ৫৫ হাজার টাকা, কোথাও ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, আবার কোথাও সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রকল্প পরিচালকের অনুমোদন ছাড়া এত বড় ব্যয়ের অসঙ্গতি সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি ক্রয়, বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের চূড়ান্ত দায়িত্ব প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।
শুধু ড্রেসিং টেবিল নয়, রূপপুর প্রকল্পে বালিশ কেনাকাটাও দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত হয়। সিএজির তদন্তে উঠে আসে, একটি বালিশ কিনতে এবং ভবনের ওপরে তুলতে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বালিশ কাণ্ড’ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এরপর একে একে সামনে আসে বিছানার চাদর, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রিন সিটি প্রকল্পে আসবাবপত্র কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়ায় ছিল অস্বচ্ছতা। বাজার যাচাই ছাড়াই ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং পরে অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। সিএজির প্রতিবেদনে সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মো. শওকত আকবরের দায়িত্ব ছিল প্রতিটি ব্যয় যৌক্তিক ও নিয়মসম্মত কি না তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তাঁর সময়েই একের পর এক অনিয়ম হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পরও দীর্ঘ সময় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়া ছাড়া এত বড় আর্থিক অনিয়ম কীভাবে সম্ভব হলো।
২০১৯ সালে গণমাধ্যমে প্রথম রূপপুর প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু হয়। তখনই বালিশ, ড্রেসিং টেবিল ও অন্যান্য সামগ্রী কেনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ সামনে আসে। দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ শুরুতে অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু পরে সিএজির নিরীক্ষা ও দুদকের অনুসন্ধানে সেই অভিযোগের সত্যতা মিলতে থাকে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম অনুসন্ধানে প্রকল্প পরিচালকসহ একাধিক প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বালিশ-কাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপূর্ত বিভাগের ২৯ জন প্রকৌশলীকে তলব করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
শুধু আসবাবপত্র নয়, বিদেশ সফর ও আবাসন ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য বাসা ভাড়া দেখানো হলেও তাঁরা বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করেছেন, যার ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এসব সময়েও প্রকল্পের প্রশাসনিক নেতৃত্বে ছিলেন মো. শওকত আকবর।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের প্রতিটি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। একটি সাধারণ সরকারি প্রকল্পের তুলনায় রূপপুরে কেনাকাটার ব্যয় কয়েক গুণ বেশি ছিল। অথচ এসব ব্যয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও অনেক প্রকৌশলী কোনো জবাব দেননি। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুর প্রকল্পে সংঘটিত অনিয়ম বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। তাঁদের মতে, একটি প্রকল্পে যদি বালিশ, ড্রেসিং টেবিল ও আসবাব কেনাতেই কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তাহলে বড় অবকাঠামোগত কাজগুলোতেও কত অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ হয়েছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এদিকে রূপপুর প্রকল্প নিয়ে আরও বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আদালতে করা আবেদনে প্রকল্প থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এমনকি ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ লোপাটের অভিযোগ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. শওকত আকবরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন, প্রকল্পের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায় এড়ানোর সুযোগ তাঁর নেই। কারণ প্রকল্পের প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনিই।
রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতির ঘটনায় এখন পর্যন্ত কয়েকজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, বড় কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে এসব তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর মতে, রূপপুর কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। সেখানে যদি দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতের মেগা প্রকল্পগুলোও একই ঝুঁকিতে পড়বে।
বর্তমানে রূপপুর প্রকল্পের নানা অনিয়ম নিয়ে নতুন করে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চলমান রয়েছে। কিন্তু জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত অভিযোগ, এত নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও এত তথ্য প্রকাশের পরও কেন মূল দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিচার হচ্ছে না? আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম মো. শওকত আকবর।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















