রাষ্ট্রীয় ২৪ সংস্থার ঋণ ৪৮ হাজার কোটি টাকা

দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি
১২ জুন ২০২২, ০৪:৩২ অপরাহ্ন
Link Copied!

অনলাইন ডেস্ক



রাষ্ট্রীয় ৩০টি করপোরেশনের মধ্যে ২৪টির কাছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে। আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ৮৯৭৫ কোটি টাকা। বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পে ঋণ নেওয়ায় এ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋণী প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ৮০৫৬ কোটি টাকা। এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই খেলাপি। অর্থাৎ ঋণ নিয়ে তারা বছরের পর বছর পরিশোধ করতে পারছে না। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) ১২টি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০০৪ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 



বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে সরকারি করপোরেশনগুলোর ঋণ ব্যবহারে বড় ধরনের দুর্নীতি রয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব, কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় ট্রেড ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ, অধিক জনবল নিয়োগ, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় অন্যতম। তবে তাদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও এখানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের পক্ষে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।



জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় করপোরেশনগুলোর দায়দেনা ও লোকসানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কখনোই বিষয়টিকে জোরালোভাবে দেখা হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, সংস্থাগুলোর লোকসান অব্যাহতভাবে বাড়ছে। তারা ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করে না। এদের রাজস্ব দায়বদ্ধতা লাখ লাখ কোটি টাকা। সংস্থাগুলো কীভাবে লাভজনক করা যায়, এ বিষয়ে বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত। তিনি বলেন, এ খাতে এত বেশি লোকসান না দিলে টাকাগুলো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা যেত।



কোন প্রতিষ্ঠানের কত ঋণ : অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪ কোম্পানির ঋণ ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ৮৯৭৫ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ৮৩৫৬ কোটি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ৭৯৯৮ কোটি, চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন ৭৪৭৮ কোটি, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ৫২৫৫ কোটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ৫০৬৬ কোটি, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ১০৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের ১০৪৭ কোটি টাকা । এছাড়াও যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ রয়েছে সেগুলো হলো বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ৬৭৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন ৯৭ কোটি, বাংলাদেশ চা বোর্ড ৯ কোটি ৬৩ লাখ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৬৭ কোটি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৪৬৬ কোটি, বিআরসিটি ৫৭ লাখ, বিআইডব্লিউটিসি ৫৮৩ কোটি, ঢাকা ওয়াসা ১৫ কোটি, বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন ৮৭৭ কোটি, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন ২০০ কোটি এবং টেক্সটাইল মিল করপোরেশনের ২৪ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আবার ১৪টি ঋণখেলাপি। এগুলো হলো বিটিএমসি, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বিসিআইসি, বিজেএমসি, বিআরটিসি, বিপিসি, টিসিবি, বিএডিসি, বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২টি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে পিডিবির লোকসান ১৮৯৫ কোটি টাকা, টিসিবি ১১৫৮ কোটি, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন ৮৮২ কোটি, বিসিআইসি ৫৫২ কোটি, বিআরসিটি ১০০ কোটি, বিআইডব্লিউসিটি ১২ কোটি, বিআইডব্লিউটিএ ৪৬ কোটি এবং বিএফডিসির লোকসান ২২ কোটি টাকা।



অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে সরকারি শিল্প করপোরেশন লোকসান দেয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, ট্রেড ইউনিয়নের অযাচিত হস্তক্ষেপ, অধিক জনবল নিয়োগ, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, পেশাদারত্বের অভাব, মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা ও অধিক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য। এ ব্যাপারে মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, কোম্পানি লাভজনক হওয়ার জন্য উন্নত ব্যবস্থাপনা দরকার। আর ব্যবস্থাপনায় সংকট থাকলে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরও কোম্পানি লাভজনক হতে পারবে না। তিনি বলেন, কোনো কোম্পানির হিসাবেও ঝামেলা রয়েছে। কিন্তু কোম্পানি লিস্টেড হলে তার হিসাব স্বচ্ছ থাকে। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ বলছে, এ ধরনের করপোরেশনের ব্যাপারে মানুষের আস্থা নেই। ফলে আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া কোম্পানি লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কম। সংস্থাটি মনে করছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান লাভজনক করতে সরকারের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনা করা হবে।