হুন্ডি এড়াতে রেমিট্যান্সে বাড়তে পারে প্রণোদনা

দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি
২৩ মে ২০২২, ০৫:১১ অপরাহ্ন
Link Copied!

রাজু আহমেদ, ঢাকা


করোনার মধ্যে বাড়ে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর প্রবাহ। সেই ধারায় ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ২৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এতে ফুলে-ফেঁপে ওঠে দেশের রিজার্ভ। প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ছাড়ায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু করোনা কমে আসার সঙ্গে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার কমতে থাকে। পাশাপাশি আমদানি বাড়ায় চাপ বেড়েছে রিজার্ভে। তাই রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনা বাড়ানোর কথা ভাবছে সরকার।


করোনা শুরুর পর রেমিট্যান্সে নগদ ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। কেউ যদি বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১০০ টাকা পাঠায়, তবে দেশে তার প্রতিনিধি সেই টাকার সঙ্গে ২ টাকা বেশি পাবে। অর্থাৎ, ১০০ টাকা এলে পাওয়া যেত ১০২ টাকা। এরপর চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) শুরু থেকে এ প্রণোদনা আরও দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এতে ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে ১০২ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু করোনার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় বেড়ে যায় হুন্ডির দৌরাত্ম্য। এর ফলে কমতে থাকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্স। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রবাসীরা দাবি করেন প্রণোদনার পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। তাদের এ দাবি সরকারও আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানা যায়।


সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীও এরকম ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেখানে পদকপ্রাপ্ত এক প্রবাসীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশের উন্নয়নে কাজ করুন, বেশি বেশি অর্থ পাঠান। আপনাদের উন্নয়নে আমরা সবকিছু করব। যেখানে যা যা করণীয়, তাই করা হবে। আমাকে বিশ্বাস করুন, আপনাদের ঠকাব না।’


অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ হার আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। রেমিট্যান্স যেন দেশে আসে, বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়লে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগবে। আপনারা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠান, সামান্য লাভের লোভে অবৈধ কোনো পন্থা অবলম্বন করবেন না। পরে যেন পস্তাতে না হয়।


এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রণোদনা বাড়ানোর একমাত্র ক্ষমতা সরকারের। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিকও সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু ব্যাংক সরকার ঘোষিত প্রণোদনার সঙ্গে নিজেরাও বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। ২ দশমিক ৫ শতাংশের সঙ্গে কয়েকটি ব্যাংক আরও দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে।’


প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বাড়ানোর যৌক্তিকতা আছে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘করোনার সময়ে প্রায় সবকিছুই বন্ধ ছিল। অবৈধ উপায়ও বন্ধ ছিল। যারা অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাত বা হুন্ডির আশ্রয় নিত, তারা বাধ্য হয়ে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানো শুরু করে। সারা বিশ্বে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এর ফলে দেশে থাকা প্রবাসীদের স্ত্রী, সন্তান এবং নিকটাত্মীয়রাও হুমকিতে ছিলেন। তাই তখন টাকা পাঠাতে আর কোনো বিকল্প না থাকায় ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠায় প্রবাসীরা। এতে রেমিট্যান্সে যে জোয়ার আসে, তা দেশের অর্থনীতিকে করোনার মতো মারাত্মক শত্রুর অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা করে। করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ায় আবার সবকিছু স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে। এর পাশাপাশি হুন্ডির চক্রটিও সক্রিয় হয়। তাই এখন রেমিট্যান্স কম আসছে। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর চেয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো সহজ এবং অধিক লাভজনক।’


তিনি বলেন, ‘হুন্ডিতে বেশি টাকা পাওয়া যায়। সে জায়গায় সরকার আরও কিছু প্রণোদনা দিয়ে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে পারে। এতে রেমিট্যান্স বাড়লে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।’


সম্প্রতি আমদানিব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ায় প্রচুর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলছেন ব্যবসায়ীরা। এতে লাগছে প্রচুর ডলার। করোনার অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার পর আমদানির চাপে রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। রপ্তানি বাড়লেও আমদানির তুলনায় ২৫ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। এদিকে রেমিট্যান্স কমায় কোনোভাবেই রিজার্ভ বাড়ানো যাচ্ছে না।


বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে আসা রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয় রেমিট্যান্সের বিপরীতে। পরের ধাপে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর তিন মাসেও দেওয়া হয় ১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা। তৃতীয় ধাপে জানুয়ারি থেকে মার্চের তিন মাসে দেওয়া হয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। মোট ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে মার্চ পর্যন্ত। পরের ধাপে এপ্রিল থেকে জুন-এই তিন মাসে বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ অঙ্ক ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে রোজা এবং ঈদকে সামনে রেখে রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। তাই প্রণোদনাও দিতে হবে বেশি। এ পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।


অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আসছে বাজেটেই এই হার বাড়তে পারে। সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। প্রবাসীদের উন্নয়নে সরকার আন্তরিক।’