ঢাকা ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বের জন্য ঋষি সুনাক সঠিক ব্যক্তি?

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে দেশটির ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের সমর্থন পেয়েছেন ঋষি সুনাক। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের দৌড় থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ঋষি সুনাকের জন্য ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দরজা খুলে যায়।

তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন যখন নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক অস্থিতিশীল সময় পার করছে ব্রিটেন। আর সুনাকও সেই ব্যক্তি, যিনি কয়েক মাস আগেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অধীনে ব্রিটেনের অর্থ মন্ত্রণালয় সামলিয়েছেন।

৪২ বছর বয়সী ঋষি সুনাক মাত্র দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে তিনি ব্রিটেনের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে এই পদে অধিষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিও তিনি। নতুন নেতা হিসাবে নিজের প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে সুনাক বলেন: ‘আমি যে দলটিকে ভালোবাসি তাকে সেবা করতে পারা এবং যে দেশটির কাছে আমি অনেক ঋণী; এখন সেই দেশকে বিনিময়ে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।’

যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাউদাম্পটনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু পিতামাতার ঘরে জন্ম নেওয়া ঋষি সুনাক যুক্তরাজ্যের অন্যতম ধনী একজন রাজনীতিবিদ। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশের আগে গোল্ডম্যান শ্যাক্স নামে একটি বিনিয়োগ ব্যাংক এবং হেজ ফান্ডে কাজ করতেন সুনাক।

ঋষি সুনাক রিচমন্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ার নির্বাচনী এলাকা থেকে ২০১৫ সালে এমপি হয়েছিলেন। আর তাই ওয়েস্টমিনস্টারের বাইরে খুব কম লোকই তার কথা শুনেছিল, কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ রাজকোষের চ্যান্সেলর অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হলে সুনাক জনসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আসার পর নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসাবে করোনাভাইরাস মহামারির বিশাল প্রভাবের মুখোমুখি হন ঋষি সুনাক। তবে কোভিড-১৯ লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা এবং কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজগুলোর কারণে ব্রিটেনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক নীল কার্টার আল জাজিরাকে বলছেন, ‘সুনাক এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেছেন যিনি অর্থ খরচ করতে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে… এবং আরও সাধারণভাবে বললে, জনসন কীভাবে মানুষের জন্য অর্থ প্রদান করবেন তা বিবেচনা না করেই ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।’

তিনি বলছেন, ‘কিন্তু কিছু কর্মকাণ্ডে উল্টো ফল দেখা দেয়। সুনাকের ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ উদ্যোগটি করোনা মহামারিতে ব্রিটেনের রেস্তোরাঁ সেক্টরকে বাঁচাতে সক্ষম হলেও তা ২০২০ সালের শরতে দেখা দেওয়া করোনার বিধ্বংসী দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রায় নিশ্চিতভাবেই অবদান রেখেছিল।’

ব্রিটিশ রাজনীতির গবেষক স্টিফেন এলস্টুব আল জাজিরাকে বলেন, ‘জনসন আপাতদৃষ্টিতে সুনাককে কাজটি করতে দিতে আগ্রহী ছিলেন।’

তিনি বলছেন, ‘মহামারি চলাকালীন এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের নিয়মিত টেলিভিশন ব্রিফিংয়ের সময়ও চ্যান্সেলর (ঋষি সুনাক) সরকারি আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী (বরিস জনসন) আমাদের যখন বলছেন- (করোনায়) কতজন লোক মারা গেছে এবং আমাদের সকলকে বাড়িতে থাকতে হবে তখনও সুনাক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা অব্যাহত রেখেছিলেন।’

কিন্তু চলতি বছর করোনা লকডাউনের সকল বিধিনিষেধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সুনাক সরকারি ঋণের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করেন। আর সেটি ঠিক এমন এক সময়ে যখন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধির সাথে কার্যত লড়াই শুরু করেছেন লোকেরা।

অধ্যাপক নীল কার্টার বলছেন, ‘কর্পোরেশন ট্যাক্স এবং জাতীয় বীমায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়ে সুনাকের সিদ্ধান্ত ব্যবসার ক্ষতি করেছে বলে ব্রিটেনের সকল রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে আক্রমণ করা হয়। আর জাতীয় বীমা যেহেতু শ্রমিকদের ওপর একটি কর, তাই এটি অল্পবয়সী লোকদের ওপর অসামঞ্জস্যভাবে প্রভাব ফেলে।’

অন্যদিকে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করার জন্য নিজের পূর্বসূরির অর্থবিহীন ট্যাক্স কমানোর গভীর সমালোচনাকারী সুনাক অবশ্য প্রচার করেন, অর্থনীতি পরিচালনা করার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি।

সমালোচকরা অবশ্য এটাকে অন্য বিষয় হিসেবে দেখেন এবং সুনাকের শাসন করার কোনো ম্যান্ডেট বা অধিকার নেই বলেও তারা নিশ্চিতভাবেই বলবেন।

জনমত জরিপে ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কেয়ার স্টারমার গত সপ্তাহে বলেন, তিনি সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত। টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘টোরিদের ব্যর্থতার ১২ বছর পরে, ব্রিটিশ জনগণ বিশৃঙ্খলার এই ঘূর্ণায়মান অবস্থা থেকে আরও ভালো কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋষি সুনাকের ম্যান্ডেটের অভাব মানে তাকে অবিলম্বে অর্থনীতির জন্য ভালো এমন বাস্তব ফলাফল আনতে হবে। নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির রাজনীতির প্রভাষক টম কেগিল বলেছেন, ‘সুনাকের ডেস্কে বেশ কয়েকটি বিষয়’ তার জন্য অপেক্ষা করছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, ‘প্রথমত: মিনি-বাজেট নিয়ে ট্রাস যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা এখনও সমাধান হয়নি। এছাড়া আর্থিক বাজারগুলো এখনও স্থিতিশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের সন্ধান করে চলেছে। তারা কিছুটা আর্থিক বিধিনিষেধও আশা করছে। প্রথম দু’টি জিনিসের চেয়ে পরেরটি কঠিন হতে পারে। কারণ বাজার এটিই চায় এবং এর জন্য সম্ভবত ব্যয় হ্রাস বা ট্যাক্স বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। আর এর কোনোটিই জনপ্রিয় হবে না।’

টম কেগিলের মতে, ‘দ্বিতীয়ত: সুনাককে তিক্তভাবে বিভক্ত একটি দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এতে সময় লাগবে এবং দলের মধ্যে এখন যে ক্ষত আর বিভক্তি রয়েছে তা দ্রুত নিরাময়ও হবে না।’

বরিস জনসনের পদত্যাগের পর কনজারভেটিভ পার্টির অনেক সদস্য সুনাককে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে দেখে থাকেন। কারণ সুনাকের পদত্যাগের সিদ্ধান্তই জনসনকে গত জুলাইয়ে ব্রিটেনের ক্ষমতা থেকে নামিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল।

তবে জনসনের পদত্যাগের পর ঋষি সুনাক কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রার্থী হয়েছিলেন এবং কনজারভেটিভ এমপিদের সর্বাধিক সমর্থন পেয়ে লিজ ট্রাসের পাশাপাশি চূড়ান্ত দু’জন প্রার্থীর একজন হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। নেতৃত্ব বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্বে সুনাককে ২১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন লিজ ট্রাস।

অন্যদিকে ব্রিটেনে আগাম সাধারণ নির্বাচনের জন্য বিরোধীদের ক্রমাগত দাবি সত্ত্বেও সোমবার আগাম ভোটের বিষয়টি সুনাককে বাতিল করতে দেখা গেছে। এদিন অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে ‘স্থিতিশীলতা ও ঐক্য’ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুনাক বলেন, ‘যুক্তরাজ্য একটি বড় (অর্থনীতির) দেশ। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি।’

টম কেগিল বলছেন, ব্রিটেনে তিনি আগাম নির্বাচন আশা করেননি। তার ভাষায়, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খুব বেশি সময় বাকি নেই এবং এই মুহূর্তে ভোটের অবস্থা বিবেচনা করলে এটি খুবই অসম্ভব যে, কনজারভেটিভ পার্টি এই মুহূর্তে আগাম নির্বাচন দিয়ে হারবে এবং খুবই খারাপভাবে হেরে যাবে।’

টম কেগিলের দাবি, ব্রিটেনে আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি জোরালো হয়ে উঠতে পারে যদি, সরকার পরিচালনার জন্য সুনাককে সংগ্রামের মুখে পড়তে হয়। যেমন বাজেট পাস করতে না পারা এবং এ ধরনের কোনো সমস্যায় আটকিয়ে যাওয়া।

স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির রাজনীতির সিনিয়র লেকচারার মার্ক শেফার্ড অবশ্য বলছেন, ব্রিটেনে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নির্ভর করবে সুনাক নিজের দলের সমর্থন জোগাড়ে কতটা সক্ষম হলেন তার ওপর।

শেফার্ড বলেন, ‘দল ঐক্যবদ্ধ না হলে, সরকার পরিচালনা কার্যত অসম্ভব করে তোলার জন্য কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে যথেষ্ট অন্তর্দলীয় মতবিরোধ রয়েছে এবং সেই পরিস্থিতিতে সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে নির্বাচনকে দেখা হতে পারে।’

তার ভাষায়, ‘তবে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে দলটি নির্বাচনে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আর তাই ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং মতবিরোধ রোধ করে তিনি যদি স্থির থাকতে পারেন, তবে তার (টিকে যাওয়ার) সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।’

এছাড়া নেতৃত্বে জয়ী হতে সুনাককে যে বিষয়টি সহায়তা করেছে তা হলো- জনসনের পদত্যাগের পর নেতৃত্ব বাছাইয়ের আগের প্রচারণার সময় সুনাকের সতর্কবাণী। সুনাক সেসময় সতর্ক করেছিলেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাসের ট্যাক্স পরিকল্পনা অর্থনীতির ক্ষতি করবে। নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাসের নীতি বাজারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে এবং এই বিষয়টিই সুনাকের সমর্থকরা জোর দিয়ে সামনে আনছেন।

আর এই যুক্তিতেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাজ্যকে পরিচালনা করার জন্য ঋষি সুনাককে নিরাপদ বিকল্প হিসাবে চিত্রিত করছেন তার সমর্থকরা।

শেফার্ড বলছেন, ‘(বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজের জন্য সুনাক সঠিক ব্যক্তি কিনা) তা কেবল সময়ই বলতে পারবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে বিকল্প অন্যদের চেয়ে বাজার সুনাককে বেশি পছন্দ করেছে বলে মনে হচ্ছে।’

সংবাদমাধ্যম বলছে, পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পদে ঋষি সুনাকের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের মূল্য ০.১৫ শতাংশ বেড়েছে।

সুনাককে ‘ব্রেক্সিটপন্থি এবং অভিবাসন বিরোধী’ উল্লেখ করে ব্রিটিশ রাজনীতির গবেষক স্টিফেন এলস্টুব বলছেন, নতুন এই টোরি নেতা ‘নিজেকে একজন ‘ফিসকাল কনজারভেটিভ’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। যিনি ছোট দেশ এবং কম করের পক্ষকে সমর্থন করেন। আর এই সবই সুনাককে দলের কর্তৃত্বে রাখবে। এছাড়া স্পষ্টতই, তিনি একজন বাস্তববাদীও।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুনাককে তার দলকে একত্রিত করার জন্য প্রকৃতপক্ষে বাস্তব পদক্ষেপ প্রদর্শন করতে হবে এবং এমন একটি দেশকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা প্রদান করতে হবে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বেশি রাজনৈতিক নাটক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী হয়েছে।

আর সেটি না হলে, ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদও সীমিত হতে পারে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published.

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বের জন্য ঋষি সুনাক সঠিক ব্যক্তি?

আপডেট সময় ০৩:৩৭:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর ২০২২

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে দেশটির ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের সমর্থন পেয়েছেন ঋষি সুনাক। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের দৌড় থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ঋষি সুনাকের জন্য ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দরজা খুলে যায়।

তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন যখন নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক অস্থিতিশীল সময় পার করছে ব্রিটেন। আর সুনাকও সেই ব্যক্তি, যিনি কয়েক মাস আগেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অধীনে ব্রিটেনের অর্থ মন্ত্রণালয় সামলিয়েছেন।

৪২ বছর বয়সী ঋষি সুনাক মাত্র দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে তিনি ব্রিটেনের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে এই পদে অধিষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিও তিনি। নতুন নেতা হিসাবে নিজের প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে সুনাক বলেন: ‘আমি যে দলটিকে ভালোবাসি তাকে সেবা করতে পারা এবং যে দেশটির কাছে আমি অনেক ঋণী; এখন সেই দেশকে বিনিময়ে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।’

যুক্তরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাউদাম্পটনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিন্দু পিতামাতার ঘরে জন্ম নেওয়া ঋষি সুনাক যুক্তরাজ্যের অন্যতম ধনী একজন রাজনীতিবিদ। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশের আগে গোল্ডম্যান শ্যাক্স নামে একটি বিনিয়োগ ব্যাংক এবং হেজ ফান্ডে কাজ করতেন সুনাক।

ঋষি সুনাক রিচমন্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ার নির্বাচনী এলাকা থেকে ২০১৫ সালে এমপি হয়েছিলেন। আর তাই ওয়েস্টমিনস্টারের বাইরে খুব কম লোকই তার কথা শুনেছিল, কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ রাজকোষের চ্যান্সেলর অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হলে সুনাক জনসাধারণের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আসার পর নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসাবে করোনাভাইরাস মহামারির বিশাল প্রভাবের মুখোমুখি হন ঋষি সুনাক। তবে কোভিড-১৯ লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা এবং কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজগুলোর কারণে ব্রিটেনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক নীল কার্টার আল জাজিরাকে বলছেন, ‘সুনাক এমন একজন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেছেন যিনি অর্থ খরচ করতে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে… এবং আরও সাধারণভাবে বললে, জনসন কীভাবে মানুষের জন্য অর্থ প্রদান করবেন তা বিবেচনা না করেই ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।’

তিনি বলছেন, ‘কিন্তু কিছু কর্মকাণ্ডে উল্টো ফল দেখা দেয়। সুনাকের ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ উদ্যোগটি করোনা মহামারিতে ব্রিটেনের রেস্তোরাঁ সেক্টরকে বাঁচাতে সক্ষম হলেও তা ২০২০ সালের শরতে দেখা দেওয়া করোনার বিধ্বংসী দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রায় নিশ্চিতভাবেই অবদান রেখেছিল।’

ব্রিটিশ রাজনীতির গবেষক স্টিফেন এলস্টুব আল জাজিরাকে বলেন, ‘জনসন আপাতদৃষ্টিতে সুনাককে কাজটি করতে দিতে আগ্রহী ছিলেন।’

তিনি বলছেন, ‘মহামারি চলাকালীন এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের নিয়মিত টেলিভিশন ব্রিফিংয়ের সময়ও চ্যান্সেলর (ঋষি সুনাক) সরকারি আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী (বরিস জনসন) আমাদের যখন বলছেন- (করোনায়) কতজন লোক মারা গেছে এবং আমাদের সকলকে বাড়িতে থাকতে হবে তখনও সুনাক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা অব্যাহত রেখেছিলেন।’

কিন্তু চলতি বছর করোনা লকডাউনের সকল বিধিনিষেধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সুনাক সরকারি ঋণের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করেন। আর সেটি ঠিক এমন এক সময়ে যখন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধির সাথে কার্যত লড়াই শুরু করেছেন লোকেরা।

অধ্যাপক নীল কার্টার বলছেন, ‘কর্পোরেশন ট্যাক্স এবং জাতীয় বীমায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়ে সুনাকের সিদ্ধান্ত ব্যবসার ক্ষতি করেছে বলে ব্রিটেনের সকল রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে আক্রমণ করা হয়। আর জাতীয় বীমা যেহেতু শ্রমিকদের ওপর একটি কর, তাই এটি অল্পবয়সী লোকদের ওপর অসামঞ্জস্যভাবে প্রভাব ফেলে।’

অন্যদিকে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করার জন্য নিজের পূর্বসূরির অর্থবিহীন ট্যাক্স কমানোর গভীর সমালোচনাকারী সুনাক অবশ্য প্রচার করেন, অর্থনীতি পরিচালনা করার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি।

সমালোচকরা অবশ্য এটাকে অন্য বিষয় হিসেবে দেখেন এবং সুনাকের শাসন করার কোনো ম্যান্ডেট বা অধিকার নেই বলেও তারা নিশ্চিতভাবেই বলবেন।

জনমত জরিপে ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কেয়ার স্টারমার গত সপ্তাহে বলেন, তিনি সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত। টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘টোরিদের ব্যর্থতার ১২ বছর পরে, ব্রিটিশ জনগণ বিশৃঙ্খলার এই ঘূর্ণায়মান অবস্থা থেকে আরও ভালো কিছু পাওয়ার অধিকার রাখে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋষি সুনাকের ম্যান্ডেটের অভাব মানে তাকে অবিলম্বে অর্থনীতির জন্য ভালো এমন বাস্তব ফলাফল আনতে হবে। নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটির রাজনীতির প্রভাষক টম কেগিল বলেছেন, ‘সুনাকের ডেস্কে বেশ কয়েকটি বিষয়’ তার জন্য অপেক্ষা করছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেছেন, ‘প্রথমত: মিনি-বাজেট নিয়ে ট্রাস যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা এখনও সমাধান হয়নি। এছাড়া আর্থিক বাজারগুলো এখনও স্থিতিশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের সন্ধান করে চলেছে। তারা কিছুটা আর্থিক বিধিনিষেধও আশা করছে। প্রথম দু’টি জিনিসের চেয়ে পরেরটি কঠিন হতে পারে। কারণ বাজার এটিই চায় এবং এর জন্য সম্ভবত ব্যয় হ্রাস বা ট্যাক্স বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। আর এর কোনোটিই জনপ্রিয় হবে না।’

টম কেগিলের মতে, ‘দ্বিতীয়ত: সুনাককে তিক্তভাবে বিভক্ত একটি দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এতে সময় লাগবে এবং দলের মধ্যে এখন যে ক্ষত আর বিভক্তি রয়েছে তা দ্রুত নিরাময়ও হবে না।’

বরিস জনসনের পদত্যাগের পর কনজারভেটিভ পার্টির অনেক সদস্য সুনাককে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে দেখে থাকেন। কারণ সুনাকের পদত্যাগের সিদ্ধান্তই জনসনকে গত জুলাইয়ে ব্রিটেনের ক্ষমতা থেকে নামিয়ে আনতে সাহায্য করেছিল।

তবে জনসনের পদত্যাগের পর ঋষি সুনাক কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় প্রার্থী হয়েছিলেন এবং কনজারভেটিভ এমপিদের সর্বাধিক সমর্থন পেয়ে লিজ ট্রাসের পাশাপাশি চূড়ান্ত দু’জন প্রার্থীর একজন হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। নেতৃত্ব বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্বে সুনাককে ২১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন লিজ ট্রাস।

অন্যদিকে ব্রিটেনে আগাম সাধারণ নির্বাচনের জন্য বিরোধীদের ক্রমাগত দাবি সত্ত্বেও সোমবার আগাম ভোটের বিষয়টি সুনাককে বাতিল করতে দেখা গেছে। এদিন অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে ‘স্থিতিশীলতা ও ঐক্য’ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সুনাক বলেন, ‘যুক্তরাজ্য একটি বড় (অর্থনীতির) দেশ। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি।’

টম কেগিল বলছেন, ব্রিটেনে তিনি আগাম নির্বাচন আশা করেননি। তার ভাষায়, ‘২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খুব বেশি সময় বাকি নেই এবং এই মুহূর্তে ভোটের অবস্থা বিবেচনা করলে এটি খুবই অসম্ভব যে, কনজারভেটিভ পার্টি এই মুহূর্তে আগাম নির্বাচন দিয়ে হারবে এবং খুবই খারাপভাবে হেরে যাবে।’

টম কেগিলের দাবি, ব্রিটেনে আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি জোরালো হয়ে উঠতে পারে যদি, সরকার পরিচালনার জন্য সুনাককে সংগ্রামের মুখে পড়তে হয়। যেমন বাজেট পাস করতে না পারা এবং এ ধরনের কোনো সমস্যায় আটকিয়ে যাওয়া।

স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির রাজনীতির সিনিয়র লেকচারার মার্ক শেফার্ড অবশ্য বলছেন, ব্রিটেনে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নির্ভর করবে সুনাক নিজের দলের সমর্থন জোগাড়ে কতটা সক্ষম হলেন তার ওপর।

শেফার্ড বলেন, ‘দল ঐক্যবদ্ধ না হলে, সরকার পরিচালনা কার্যত অসম্ভব করে তোলার জন্য কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে যথেষ্ট অন্তর্দলীয় মতবিরোধ রয়েছে এবং সেই পরিস্থিতিতে সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে নির্বাচনকে দেখা হতে পারে।’

তার ভাষায়, ‘তবে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে দলটি নির্বাচনে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আর তাই ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং মতবিরোধ রোধ করে তিনি যদি স্থির থাকতে পারেন, তবে তার (টিকে যাওয়ার) সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।’

এছাড়া নেতৃত্বে জয়ী হতে সুনাককে যে বিষয়টি সহায়তা করেছে তা হলো- জনসনের পদত্যাগের পর নেতৃত্ব বাছাইয়ের আগের প্রচারণার সময় সুনাকের সতর্কবাণী। সুনাক সেসময় সতর্ক করেছিলেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাসের ট্যাক্স পরিকল্পনা অর্থনীতির ক্ষতি করবে। নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাসের নীতি বাজারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে এবং এই বিষয়টিই সুনাকের সমর্থকরা জোর দিয়ে সামনে আনছেন।

আর এই যুক্তিতেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাজ্যকে পরিচালনা করার জন্য ঋষি সুনাককে নিরাপদ বিকল্প হিসাবে চিত্রিত করছেন তার সমর্থকরা।

শেফার্ড বলছেন, ‘(বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজের জন্য সুনাক সঠিক ব্যক্তি কিনা) তা কেবল সময়ই বলতে পারবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে বিকল্প অন্যদের চেয়ে বাজার সুনাককে বেশি পছন্দ করেছে বলে মনে হচ্ছে।’

সংবাদমাধ্যম বলছে, পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পদে ঋষি সুনাকের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের মূল্য ০.১৫ শতাংশ বেড়েছে।

সুনাককে ‘ব্রেক্সিটপন্থি এবং অভিবাসন বিরোধী’ উল্লেখ করে ব্রিটিশ রাজনীতির গবেষক স্টিফেন এলস্টুব বলছেন, নতুন এই টোরি নেতা ‘নিজেকে একজন ‘ফিসকাল কনজারভেটিভ’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। যিনি ছোট দেশ এবং কম করের পক্ষকে সমর্থন করেন। আর এই সবই সুনাককে দলের কর্তৃত্বে রাখবে। এছাড়া স্পষ্টতই, তিনি একজন বাস্তববাদীও।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুনাককে তার দলকে একত্রিত করার জন্য প্রকৃতপক্ষে বাস্তব পদক্ষেপ প্রদর্শন করতে হবে এবং এমন একটি দেশকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা প্রদান করতে হবে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বেশি রাজনৈতিক নাটক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী হয়েছে।

আর সেটি না হলে, ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদও সীমিত হতে পারে।